• আজ ২৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

স্ত্রী ডিভোর্স দিলেও স্বামী দেনমোহর পরিষোধ করতে হবে?

৬:১২ পূর্বাহ্ণ | জুন ২১, ২০২০ রাজনীতি

দেনমোহর কি? কখন দেওয়া উত্তম? কত দিলে ঠিক হবে? মাফ করা যায় কি না?? তবে কিভাবে??

আইনজীবী হিসেবে এমন প্রশ্ন আমরা নিয়মিত শুনে থাকি। ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক দেহমোহর হচ্ছে বিবাহবন্ধন উপলক্ষে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে নগদ অর্থ, সোনা রুপা বা স্থাবর সম্পত্তি দান করা।এটা পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।

এই অধিকার মুসলিম আইনের উৎস পবিত্র কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। হানাফি আইন অনুসারে দেনমোহর সর্বনিম্ন ১০ দিরহাম এবং মালিকি আইনে ৩ দিরহাম তবে সর্বোচ্চ অনির্ধারিত। দেনমোহর নির্ধারিত থাকতে পারে আবার অনির্ধারিতও হতে পারে।

দেনমোহরের পরিমাণ সাধারন পরিবারের অন্যান্য সদস্য (ফুফু, বোন) অথবা পরিবারের আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক যোগ্যতার বিষয়টির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পাত্রের আর্থিক সঙ্গতি, সামাজিক এবং পারিবারিক অবস্থান ও দেনমোহর নির্ধারণে বিবেচনায় নিতে হয়।
নির্ধারিত দেনমোহরের দুটি অংশ থাকে।

একটি অংশ হলো তাৎক্ষণিক দেনমোহর- মোহরে মুআজ্জল বা নগদে প্রদয় এবং আরেকটি অংশ হলো বিলম্বিত দেনমোহর – মোহরে মুয়াজ্জাল বা বাকীতে প্রদেয়। আমাদের দেশে বাকি রেখেই বিয়ে করার প্রথা বেশি। এবং পরবর্তীতে ভূলে যায়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝড়গা – ঝাটি না হলে আর মনে রাখে না দেনমোহর এর কথা।

স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেনমোহর পরিশোধ করা উত্তম। শরিয়াহ মতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে কিংবা প্রথম মিলনের রাতের আগেই নগদে পরিশোধ করা সবচেয়ে উত্তম। বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার ৩ বছরের মধ্য দেনমোহরের টাকা চেয়ে মামলা দায়ের করা অন্যথায় ৩ বছরের বেশি হলে দেনমোহরের টাকা চাওয়ার অধিকার হারায়।

স্বামী মারা গেলে দাফনের এবং কবর দেওয়ার পর স্বামীর যে সম্পদ তার থেকে স্ত্রী চাইলে দেনমোহর সমপরিমাণ সম্পদে দখলে রাখতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তার উত্তারাধিকার হিস্যা খর্ব হবে না।
স্ত্রী চাইবা মাত্র স্বামী দেহমোহরের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হইলে স্ত্রী স্বামীর সাথে না থাকলেও স্বামী ভরন-পোষণ দিতে বাধ্য। সেক্ষত্রে স্বামী দাম্পত্য অধিকার পূনঃরুদ্ধারের মামলা করলে মামলাটি খারিজ হবে।

আমাদের দেশে অনেকে নিয়মিত নামাজ পড়েন রোজা রাখেন কিন্তু দেনমোহরের বিষয়ে সচেতন না। এ বিষয়ে তারা এতো উদাসীন যে নফল নামাজের বিষয়ে যতটা গুরুত্ব দেন স্ত্রী বাকি দেনমোহরের বিষয়ে এর সিকিভাগ ও গুরুত্ব দেন না। অনেকে বিবাহের প্রথম রাত্রে কৃত্রিম ভালোবাসার মাধ্যমে দেনমোহর মাফ করিয়ে নেন। স্ত্রী মনে করে মা -বাবা, পাড়া প্রতিবেশি এবং আত্নীয় স্বজন ছেড়ে এসেছে নতুন পরিবেশে সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে মাফ করলেও মাফ হয় না।

আবার স্বামী মারা গেলে খাটে তোলার আগে পাড়া প্রতিবেশীরা এসে দেনমোহরের টাকা মাফ চাইলে সদ্য বিধবা স্ত্রী মাফ করে দিতে বাধ্য হয়। ইমোশনাল, ঠগ, প্রতারণা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মাফ করাইয়া নিলে মাফ হয় না। রাসুল(সাঃ) বলেছেন কোনো মুসলমানের জন্য কারো সম্পদ হালাল হবে না যদি না সে তাকে সন্তুষ্ট চিত্তে দান করে। বিয়ের সময় সাঝানো, কসমেটিক, শাড়ি, কাপড় চোপড়, স্বর্নালংকার ইত্যাদি উপহার হিসেবে দিয়ে দেনমোহরের অর্ধেক পরিশোধ ধরা হয়।
উপহার দেনমোহর হিসেবে গন্য হবে না।

সবচেয়ে প্রচলিত বড় ভূল ধারনা হলো স্ত্রী নিজে তালাক দিলে ( তালাক -ই – তাফইজ) তাহলে স্বামীকে দেনমোহর পরশোধ করতে হবে না। দেনমোহর সর্বাস্থায় স্বামীর ঋন। দেনমোহর কখনোই মাফ হবে না।

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে এই আইনে সন্নিবেশিত কোনো কিছুই কোনো বিবাহিত মহিলার বিবাহ বিচ্ছেদ এর ফলে মুসলিম আইন অনুযায়ী তার প্রাপ্য দেনমোহর অথবা তার কোনো অংশের উপর তার অধিকারকে ক্ষুন্ন করবে না।

মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ অনুযায়ী সালিশী পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিবাহ করলে তার বর্তমান স্ত্রী যাবতীয় বিলম্বিত দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে। ঐ অর্থ পরিশোধ না হলে তা বকেয়া রাজস্বের মতো আদায় হবে।

স্বামীর একচ্ছত্র তালাকের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে দেনমোহর। এতে স্ত্রীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়। কিন্ত বিয়ে শুধুই দুটি দেহের যৌন চাহিদা পূরনের একটি দেওয়ানি চুক্তি নয়, দুটি হৃদয়েরও মিলন ঘটে এর মাধ্যমে।

তাই দেনমোহর বেশি ধার্য্য করে স্বামীর অক্ষমতাকে পূজি করে বিবাহ বিচ্ছেদ কিছুটা টিকিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্ত মেলবন্ধনহীন সেই সম্পর্কে হৃদয়ের উষ্ণতা কতোটুকু থাকবে তা ভাবার বিষয়- তবে লক্ষ রাখতে হবে, বিয়ে যেনো কারো ঘাড়ে লাশের বোঝা না হয়ে যায়।

লেখক : আইনজীবি, ঢাকা জজ কোর্ট