• আজ ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

করোনায় বেড়েছে শিশুশ্রম

ছোট কাধেঁ বড় ভার, নরম হাতে জীবিকার শক্ত হাল

| নাজমুল শাহাদাৎ জাকির, স্টাফ রিপোর্টার ২:৩৮ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১ সারাদেশ

যে বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, যে সময় থাকার কথা খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বিহঙ্গের মত খেলার মাঠে ব্যাট-বল কিংবা সাইকেল নিয়ে, সেই সময়ে জীবিকার তাগিতে সাতক্ষীরা পৌর এলাকার একটি ওয়ার্কশপের দোকানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ১০বছর বয়সী শাওন ও ১৩বছর বয়সী ফাহিম হোসেন (ছদ্মনাম)।

যেকোন সময়ে একটু অসাবধানতার কারনে নষ্ট হতে পারে তাদের চোখ এমনকী শরীল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে হাত কিংবা হাতের আঙুলের। তবে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারনে শৈশবের দুরন্তপনাকে ভূলে যেয়ে দু’মুঠো ভাতের আশায় ছোট কাধেঁ বড় ভার নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে শাওন ও ফাহিমকে। রবিবার বিকালে সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্কশপে তাদের সাথে কথা হলে এমনটি জানান তারা।

এসময় শিশু শ্রমিক শাওন জানান, তার জন্মের পরেই তার মায়ের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তার পিতার। সেই থেকে মায়ের আদর স্নেহে বড় হতে থাকে সে। তবে অসুস্থ্য মায়ের চিকিৎসার ভরণপোষণ যোগাতে ওয়ার্কশপে কাজ করতে হচ্ছে। সকাল ৯টায় শুরু হওয়া কর্মব্যস্ততা চলে রাত ১০টা পর্যন্ত।

শাওনের মতো প্রায় একই অবস্থা শিশু ফাহিম হোসেনের। ফাহিমের জন্মের পরই মারা যান তার পিতা। সেই থেকে মায়ের আশ্রয়ে বড় হতে থাকে সে। তবে অভাবের সংসারে লেখাপড়া করানো সম্ভব না বলে ফাহিমকে ওয়ার্কশপটিতে কাজ করতে পাঠান মা। অসুস্থ্য মায়ের চিকিৎসার খরচ মেটাতে না চাইতেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করতে হচ্ছে বলে জানায় সে।

এসময় ফাহিম ও শাওন আবেগপ্রবণ কন্ঠে জানান, এখন খেলাধুলা কিংবা বই হাতে নেওয়ার ফুসরত মেলে না তাদের বরং পরিস্থিতি তাদের নরম হাতে জীবিকার শক্ত হাল ধরতে বাধ্য করেছেন। শুধু ফাহিম শাওন নয় বরং ফাহিম শাওনের মতো সাতক্ষীরা জেলার ১লক্ষেরও অধিক শিশু সরাসরি বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত।

যদিও সাতক্ষীরা জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের তথ্যনুযায়ী সাতক্ষীরার মোট শিশুর মধ্যে কর্মজীবী বা শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৫ শতাংশ অথাৎ সাতক্ষীরায় ৭০ হাজারের অধিক শিশু সরাসরি বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে বর্তমানে করোনার কারনে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ১লক্ষেরও অধিক হয়েছে (তথ্যসূত্র: জেলা পরিসংখ্যান অফিস)। অথচ টেকশই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮নং গোল হল শোভন কর্ম পরিবেশ।

বাংলাদেশসহ ১৯৪টি দেশ শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং ২০১৩ এর সংশোধনী অনুসারে কর্মরত শিশু বলতে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে তাদেরকে বোঝায়। এই শ্রম অনুমোদনযোগ্য। তবে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি কোনো ধরনের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে সেটা শিশুশ্রম হবে।

তারাও কর্মরত শিশুদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে স্বীকৃত। ইতিমধ্যে বিবিএস ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে সমীক্ষার কাজ শুরু করেছে। ২০১৩ সালের জরীপ তথ্যানুযায়ী দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের শিশু বলা হচ্ছে। মোট শিশুর ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হলো শিশুশ্রমিক। ১২ লাখ ৮০ হাজার ঝুঁকিপুর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রমিকের মধ্যে ছেলে ৭ লাখ ৭০ হাজার এবং মেয়ে ৫ লাখ ১০ হাজার।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী কোন পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে শিশুকে নিয়োগ করে তাকে ৫হাজার পর্যন্ত অর্থদন্ড প্রদানের বিধান থাকলেও বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ না থাকাই শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। দারিদ্র্যের কষাঘাতে একজন পিতা/মাতা যখন তার পরিবারের ভরণপোষণে ব্যর্থ হয়, তখন ঐ পিতা/মাতার পক্ষে তার সন্তানদের পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ রাখা আর সম্ভব হয়ে উঠে না।

আর এভাবে একটি শিশু একবার পারিবারিক বন্ধন হতে বিছিন্ন হবার পর সে হারিয়ে যায় অগণিত মানুষের ভিড়ে এবং তাকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার সন্ধানে। আর এই সুযোগে দেশের প্রচলিত আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ঝালাই, স্প্রে-পেইন্টিং, গ্যারেজ, হোটেল-রেস্তোরা, ইটভাটাসহ নানা ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় সেখানে নামমাত্র বেতনে শিশুদেরকে দিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করাচ্ছেন। অথচ চলতি বছরের ১২ জুন ‘মুজিববর্ষের আহ্বান, শিশু শ্রমের অবসান’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত হলেও শিশুদের শ্রম বন্ধ তো হয়নি উপরন্তু শ্রমে শিশুদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে।

বিবিএস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০২১ এর মাধ্যমে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জরিপ শুরু করেছে বিবিএস। আগামী ১৮ মাসের এই জরীপ প্রকল্পে মোট খরচ ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৯১ হাজার টাকা বা ২ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৩ দশমকি ৫৪ ডলার। জরিপের কাজ শেষ করা হবে ২০২২ সালের জুন মাসে। জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০০২-২০০৩ মেয়াদে প্রথম সূচনা হয়।

এরপরে ২০১৩ সালের দ্বিতীয় সমীক্ষা করা হয়। এখন তৃতীয় বারের মতো দেশে শুরু হলো জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা-২০২১। তবে সরকার শিশু শ্রম বন্ধে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও এ বিষয়ে প্রশাসন থেকে সাতক্ষীরায় কর্মরত শিশু শ্রমিকদের কখনও নিষেধ করা হয়নি। বেসরকারিভাবে কয়েকটি এনজিও সংস্থা কাজ করলেও শিশু শ্রমিক রাখা আইনে নিষিদ্ধ এই বিষয়টি জানা নেই সাতক্ষীরায় কর্মরত শিশু শ্রমিকদের। ফলে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে শিশু বয়সে কাজ করতে যাওযায় বেতন বৈষম্য ও শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে শিশুরাই।

শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের করে তাদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসনের দাবি সচেতন মহলের। তবে করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা সন্তানদের কাজে যুক্ত করে দিচ্ছে। বিশেষ করে মাদক বা খারাপসঙ্গ থেকে রক্ষা করতে কাজে ঠেলে দিচ্ছে বলে দাবি করেন জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

এবিষয়ে যশোর জেলার শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা ও সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকা সাধন দাস বলেন, করোনার আগে শিশুশ্রম বন্ধে তারা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড করতেন। করোনায় সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এর সঠিক পরিসংখ্যান তার কাছে নেই।

এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ন কবির বলেন, সরকারের শিশুবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে শিশুশ্রম কমে আসছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরায় কতহাজার শিশু বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত সেটা সমন্ধে অজ্ঞাত তিনি। তবে শিশুশ্রমের ডাটা সংগ্রহকরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।


করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন পিপলস নিউজ‘এ । আজই পাঠিয়ে দিন feature.peoples@gmail.com মেইলে