হুমাযুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম: জিলাপী বিক্রির ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া ফেলে দেয়া কুড়িগ্রামের কনটেন্ট ক্রিয়েটরতাইজুল ইসলাম তাজুকে নিয়ে এখন ব্যাপক ক্রেজ তৈরি হয়েছে। মিডিয়ায় তাকে নিয়ে চলছে নানানআলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। প্রতিদিন তার বাড়িতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেআগ্রহী লোকজন। দেয়া হচ্ছে নানান প্রতিশ্রুতি। এসব প্রতিশ্রুতি ও টানা সাক্ষাৎকার দিতেদিতে ক্লান্ত তাইজুলের এখন দিশেহারা অবস্থা!তাইজুলএই প্রতিবেদককে জানান, ‘আমি ঠিকমতো খাইতে পারছি না, বিশ্রাম নিতেও পারছি না। প্রতিদিনমিডিয়া ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাথে সময় দিতে দিন চলে যায়। নিজের কাজ কিছুই করতে পারছিনা।’কুড়িগ্রামেরনাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ঢাকডহর সরকার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল ইসলামতাজু(৩২)। বাবার নাম সিরাজ উদ্দিন এবং মায়ের নাম তাহেরা বেগম। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যেতাইজুল সবার বড়। তার দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সুফিয়া সামনে এসএসসি পরীক্ষা দিবে।এছাড়াও তার ছোট ভাই মাইদুল ইসলাম কুড়িগ্রাম আলিয়া মাদ্রাসায় ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। নিজেলেখাপড়া করার সুযোগ না পেলেও কায়িক পরিশ্রম করে ভাই-বোনদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে প্রাণপণচেষ্টা করছেন তাইজুল। বাবা ও মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। দুজনেই অসুস্থ্য ফলে তাইজুলের আয়েচলছে পুরো সংসার। এখন তার ছোট ভাই মাইদুল ইসলামও মাঝে মধ্যে বাইরে শ্রমের কাজ করে পরিবারকেসহায়তা করছে।নারায়ণপুরইউনিয়নটি নাগেশ্বরী উপজেলা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন একটি ইউনিয়ন। এটি একটি দ্বীপইউনিয়ন। ব্রহ্মপূত্র, দুধকুমর ও গঙ্গাধর নদী পেরিয়ে নারায়ণপুরে যেতে হয়। নারায়ণপুরেরপূর্ব ও উত্তর কোণ ঘেঁষে আছে ভারতীয় সীমানা। শুকনো মৌসুমে ভারতে পায়ে হেঁটে যাওয়া গেলেওজেলার সাথে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন বিকল্প পথ নেই। এই ইউনিয়নে শিক্ষার্থীদের জন্যএকটি করে বালক ও বালিকা বিদ্যালয় থাকলেও কোন কলেজ না থাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বঞ্চিতএই ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা।
প্রতিবছরবন্যা, খরা, নদী ভাঙন ও শৈত্যপ্রবাহের সাথে এখানকার মানুষকে লড়াই করতে হয়। এই লড়াইয়েঅনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। অনেকে নদীর নতুন চর, নতুন পলিমাটি পেয়ে নতুন আশায় আবারবুক বাঁধেন।কৃষিএখানকার মানুষের প্রধান পেশা। কৃষির পাশাপাশি অনেক পরিবার মৎস শিকারের সাথে জড়িত। এছাড়াওসীমান্ত এলাকা হওয়ায় অনেকে অবৈধ চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। এসব নানানপ্রতিকূল পরিবেশ, ভোগান্তি ও প্রতিবন্ধকতাই তাইজুলের ভিডিওতে ফুটে এসেছে। ব্যক্তিগতভাবেতাইজুল একজন রাজমিস্ত্রীর হেলপার। ঢাকা শহরে বিভিন্ন ইমারত নির্মাণ কাজে সে শ্রম বিক্রিকরে। বছরে দুইবার দুই থেকে তিন মাস বাইরে কাজ করে যা উপার্জন করে সেই টাকা দিয়ে চলেভাইবোনদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ। চরম অভাব ও অনটনের কারণে খুব মানসিক চাপের মধ্যদিয়ে কাটে তাইজুলেরদিন। বাড়িভিটা না থাকায় অন্যের জমিতে দুটো টিনের ঘর তুলে সেখানে গাদাগাদি করে থাকতেহয় তাদেরকে।সংসারেএমন দৈনতা থাকার কারণে এক সময় তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়। প্রায় দুই বছরপূর্বে তার বিয়ে হয়। বিয়ের ৩/৪ মাসের মধ্যে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে ভীষণএকা হয়ে যায় তাইজুল। মনের দু:খ কষ্ট ভুলতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক শিল্পীদের সাথে মেলামেশাশুরু করে। এভাবে কিছুটা সময় চলে যায়। পরে টাকা জমিয়ে একটি এনড্রয়েড মোবাইল কিনে ভিডিওকরা শুরু করে। গত দেড় বছরে প্রায় ১৪০টি ভিডিও করেছে বলে জানায় তাইজুল।এব্যাপারে এই প্রতিবেদককে তাইজুল বলেন, সংসারে এত কষ্ট এত দু:খ বলার মতো নয়। কাউকে মনেরকথা খুলে বলতেও পারি না। এই মনের কষ্ট গোপন রাখার জন্য ভিডিও ধারণ করা শুরু করি। এতেআমাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় কবিরুল ইসলাম সরকার কবির মেম্বার ও ব্যাংক কর্মকর্তা শাহআলম। অবেলা মিউজিক নামে এদের একটি সাংষ্কৃতিক দল আছে। এরা গান বাজনার সাথে জড়িত। এদেরসাথে থাকতে ভালো লাগে। এরাই আমাকে মেবাইল চালাতে ভিডিও করতে এবং পেজ খুলে আপলোড করতেসহযোগিতা করেছে। তাইজুল ইসলামের তাজু ২.০ নামের পেজটিতে ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার।এখন যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখে। এছাড়াও তার ইউটিউব খোলার দুদিনের মধ্যে ফলোয়ার সংখ্যাদাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার।তাইজুলসম্পর্কে অবেলা মিউজিকের পরিচালক কবিরুল ইসলাম সরকার ওরফে কবির মেম্বার বলেন, আমারজীবনে তাইজুলের মতো সৎ মানুষ আমি আর দেখিনি। তার কাছে লাখ লাখ টাকা জমা রাখলেও সে একটিটাকা এদিক ওদিক করবে না। তার পরিবারে অনেক সমস্যা তারপরেও সততা তার বড় গুণ। আমরা যতটুকুপারি তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করি। দুই বছর পূর্বে আবার মোবাইল দিয়ে তাইজুলকে ভিডিওকরা শেখাই। সে খুব সাদামাটা ও সহজ সরল ছেলে। তার মধ্যে কোন ভনিতা নেই। কোন অহংকার নেই।তবেমিডিয়ায় আলোচিত হওয়ার পর থেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুক্ষিণ হয়েছেন তাইজুল ভাই।এখন তাকে নানান ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা হচ্ছে। অনেক উপঢৌকন নিয়ে এসে রিল করছেন। তাদেরকেকিছুই বলতে পারছেন না তাইজুল ইসলাম। বাধ্য হয়ে তাদের সাথে ভিডিও করছেন। এদিকেকৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত উপজেলানির্বাহী কর্মকর্তা বদরুজ্জামান রিশাদ তাকে নারায়ণপুরে খাস জমি বন্দোবস্ত করে বসতবাড়িনির্মাণসহ তার পরিবারকে কিছু কৃষি জমিরও বন্দোবস্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এসময়তার কাছে নগদ ১০ হাজার টাকা হস্তান্তর করা হয়। বিতরণ অনুষ্ঠানে ‘পথশিশুর’পক্ষ থেকে কালবৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্থ তাইজুলের ঘর মেরামতের জন্য দুই বান্ডিল টিন ও ৫ হাজারটাকা প্রদান করা হয়।আলোচিততাইজুল ইসলাম গত ৩দিনের মধ্যেই অনেকটা পাল্টে গেছেন। এখন তার শরীরে শোভা পাচ্ছে নতুনপোষাক। বিভিন্ন উপঢৌকনে ভাসছেন তিনি। ভিডিওতে চিরচেনা তাইজুল ভাইকে এখন দেখা যাবে নতুনআঙ্গিকে।তাইজুলইসলাম জানান, চলতি বছরের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানেরপাশে একটি জিলাপির দোকানে গিয়ে ভিডিও করেছিলাম। সেই ভিডিওটা দিয়েই আমি প্রথম ভাইরালহই।ভিডিওতেদেখা যায় তিনি বলছেন, ‘অনেক এখানে দোকানপাট, অনেক জিলাপি ভাজতাছে। তার কাছে আমি প্রশ্নকরবো-জিলাপি কত করে বিক্রি করেন? সাদাডা কত, লালডা কত? পরে তিনি দোকানিকে প্রশ্ন করেন,জিলাপি আজকে কত করে বেজতাছেন, সরকারি রেটে? যদি জনগণকে বলতেন তাহলে অনেক খুশি হইতাম।’এই ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কেউ ভিডিওটি বিনোদনহিসেবে প্রশংসা করেন, কেউবা ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন। তবে ভিডিওটি প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষদেখেন। এখান থেকেই সকলের নজর কাড়েন তাইজুল ভাই।তাইজুলইসলাম তাজুকে নিয়ে প্রথম সাক্ষাৎকার নেয়া কুড়িগ্রামের সাংবাদিক হুমায়ুন কবির সূর্যবলেন, আমি অফিস থেকে এ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে প্রথম নারায়ণপুরে যাই। ভোর ৬টায় মটর সাইকেলেরওয়ানা দেই। ৪টি নদী পেরিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় সেখানে পৌঁছাই। অনেক কাঠখড় পুরিয়ে ১১টারদিকে তার সাক্ষাৎ পাই। অনেক অনুরোধ করে আধাঘন্টা সময় নেই। তিনি রাজি হলে, আমি তার সাথেঅনেক মনযোগ সহকারে কথা বলে তাকে যাচাই করার চেষ্টা করি এবং সেভাবে ইন্টারভিউটা নেয়াশুরু করি। বিশেষ করে সাক্ষাৎকারে এই পেশায় আসার সরল স্বীকারোক্তিতে তাইজুল ভাই যখনবলেন-‘সংসারের অভাব অনটন আর দু:খ কষ্ট ভুলতে ভিডিও ধারণ করি এবং আমি মুখ্যসুখ্য মানুষআমাকে কেউ সাংবাদিক বলবেন না। আমি সাংবাদিক নই। তার এই দুটি উক্তি চ্যানেলগুলোতে প্রচারেরপর তিনি আরও লাইম লাইটে চলে আসেন। আমিখুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছি, তাইজুল ভাই একজন সহজ সরল মানুষ। কোন ঘোরপ্যাচ বোঝেন না।গুছিয়ে আপনার মনের মত উত্তর দিতে পারবেন না। কিন্তু তার পেশাগত কাজে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণসৎ ও নির্ভিক। তার ধারণ করা ১৪০টি রিল দেখলে আপনার অবশ্যই মনে হবে তিনি একজন সমাজ সচেতনব্যক্তি। বিচ্ছিন্ন একটি এলাকায় অবস্থান করে সেই এলাকার দু:খ দুর্দশা যেভাবে ভিডিওরমাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন যা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। তিনি কখনোই নিজের কথা বাপরিবারের কথা বলেন নি। এখানেই তাইজুল ভাইয়ের স্বাতন্ত্রতা লক্ষ্য করা যায়। তবে মিডিয়ারলোকজন ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যেভাবে তাইজুল ইসলামকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করছেন তারগোপনীয়তা উন্মুখ করছেন এটা মোটেই ভাল কাজ নয়। তাইজুল ভাইকে তার মতোই থাকতে দেয়া দরকার।না হলে প্রকৃত তাইজুল ইসলামকে আমরা এক সময় হারিয়ে ফেলবো।’# নিউজটোয়েন্টিফোর থেকে শ্রাবণ ভাই ও নিয়াজ ভাই যখন এ্যাসাইনমেন্টা দিল তখন খুবই আপসেট হয়েগেলাম। কারণ এর আগে আমি নারায়ণপুরে গিয়েছি, সেই যাওয়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভাল ছিল না।পকেটে টাকা পয়সা না থাকায় রিজার্ভ নৌকার আশা ত্যাগ করে বিকল্প পথে ভোর ৬টায় রওয়ানাহলাম। সাথে ঢাকা পোস্টের মমিনুল বাবুকে নিলাম। কুড়িগ্রাম থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার ঘুরেপ্রথম কালিগঞ্জ নৌঘাটে পৌঁছলাম। সেখানে দুধকুমার নদী পাড় হয়ে। দুর্গম চরাঞ্চলের বালুচরও কাদামাখা সড়ক পাড়ি দিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট পর পৌঁছলাম কচাকাটা ইউনিয়নের মাঝিপাড়া ঘাটে।সেখানে গঙ্গাধর নৌঘাটে সাড়ে ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে মাঝির দেখা পেলাম। সেইঘাট পেরিয়ে চরাঞ্চলের কাদাময় পিচ্ছিল রাস্তায় মটর সাইকেল চালিয়ে মনে হল এই রাস্তা দিয়েআর ফেরা যাবে না! কিছুক্ষণ পর আরেকটি নদী পেরুতে গিয়ে দেখলাম ঘাট থেকে অনেক দূরে নৌকাঅপেক্ষা করছে। কারণ পানি কম। ফলে পানির উপর বাইক চালিয়ে নৌকায় মটর সাইকেলসহ উঠালাম।এই নদী পেরিয়ে সবচেয়ে খারাপ রাস্তার মুখোমুখি হলাম। শেষ পর্যন্ত পৌঁছলাম চৌদ্দকুড়িঘাটে। এখানেও পানির উপর বাইক চালিয়ে নৌকায় উঠলাম। এরপর আমরা নারায়ণপুর বাজারে পৌঁছলামসকাল সাড়ে ৯টার দিকে। তখন দুজনেই ক্ষুধার্ত। একজনকে বলে বাজারের ভাল হোটেল সনাক্ত করে সেখানে খেতে বসলাম। ছোট ছোট পুরি ওপাতলা ডাল দিয়ে নাস্তা শেষ করলাম। এখানে জানতে পারলাম এই হোটেলের জিলাপি নিয়ে তাইজুদ্দিনভিডিও করেছে। ওদের কাছ থেকে তাইজুদ্দিনের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে তাকে ফোন করলাম।তিনি জানালেন, ভিডিও করতে ব্যস্ত! কুড়িগ্রাম থেকে আরও সাংবাদিক আসছে আমি একসাথে সবারসাথে কথা বলবো। আমি অনুরোধ করলাম আমার মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগবে। এই সময়টুকু দেন। পরেজানলাম এই সহজ সরল মানুষটি ঠিকমতো যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন না বলে স্থানীয় কবিরুলমেম্বার তার হয়ে সমস্ত কাজ করেন। আমাকে অনেকেই কবিরুল মেম্বারের সাথে কথা বলতে বললেন।কিন্তু আমি সরাসরি তাইজুদ্দিন ভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ পর পর যোগাযোগ করছিলাম। এরমধ্যেবাথরুমের চাপ আসায় ওখানে ব্রাক অফিসের স্মরণাপন্ন হলাম। তারা আমাদেরকে খুব সহযোগিতাকরলেন। এমন করে এগারো বেজে গেল। কিন্তু তাইজুল ভাইকে আমরা ধরতে পারছিলাম না। ফলে কবিরুলমেম্বারের স্মরণাপন্ন হলাম। তিনি বললেন নারায়ণপুর বাজারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত ইসলামীব্যাংকে আসুন সেখানে কথা হবে। এই ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহ আলম ও কবিরুল মেম্বারের একটিসাংস্কৃতিক দল আছে। এই দলেই বেশিরভাগ সময় কাটান তাউজুদ্দিন ভাই। শাহ আলম ভাই জানালেনতিনিই তাইজুদ্দিন ভাইয়ের ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব পেজ খুলে দিয়েছেন। এই দুজনেই তার মোবাইলেবেশিরভাগ ভিডিও পোস্ট করেন। কিছুক্ষণ পর কবিরুল মেম্বার এলেন। ইয়াং এনার্জেটিক ছেলে।আমাকে দেখে লম্বা সালাম দিল। হেসে বলল, স্যার আমি কবির। আপনি আমাকে দুই দিনের শিশুসাংবাদিকতার উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন! বললাম, তুমি সাংবাদিকতা করো না? কবির বলল, নাআমি এবার সবার অনুরোধে ইউপি নির্বাচনে মেম্বার পদে দাঁড়িয়েছিলাম, হয়েও গেলাম। তার কাছেআরও জানতে পারলাম কুড়িগ্রাম থেকে জাতীয় আরও কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা আসছেন।তাদের জন্য আমাকে অপেক্ষা করানো হচ্ছে। আমি দশ মিনিট সময় চাইলাম। যাতে আলাদাভাবে কাজকরতে পারি। কবির বাড়ি থেকে তাইজুদ্দিনকে তুলে আনল। আমরা পাশেই একটি ক্ষেতের কাছে গিয়েতাইজুদ্দিনকে নিয়ে প্রথম শ্যুট করলাম। আমাকে অফিস থেকে নির্দেশনা দেয়া হলেও সহজ সরলএই ভাইটির সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম সে আমাদের মত সবজান্তা নয়। কঠিনভাবে কোন কিছুচিন্তাও করে না। ফলে আমাদের ধামাধরা প্রশ্নে তার ইন্টারভিউটা নেয়া যাচ্ছিল না। ফলেভিডিও শ্যুট বন্ধ করে তার সাথে কথা বলে তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে চেষ্টাকরলাম। সে আসলেই সবকিছু তারমতো করে ভাবতে ও বলতে পছন্দ করে। তাকে সুন্দরভাবে কিছু বলতেহয় না, তার মনের গহিন থেকে যেসব কথা উঠে আসে তাই সে বলে যায়। এরমধ্যে তার কোন নিজস্বকষ্টের কোন কথা নেই। সব কথা এলাকার মানুষ ও এলাকার দুর্ভোগ নিয়ে। পরে ইন্টারভিউ শুরুকরলাম। তার মনের ভিতরটাতে ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা করলাম, সে শক্ত মুখোশ খুলে চেপে রাখাকষ্টের বাঁধ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারল না। এরপর তার কথায় আমরা জানতে পারলাম তাকে ট্রল করাতেসেও কষ্ট পেত! কিন্তু পরিবারের অভাব অনটনের কাছে সে সব কষ্ট কোন কষ্টই ছিল না। আর এসবকষ্ট ভুলতেই ভিডিও করে সে সময় কাটাতো । এছাড়াও তার স্পষ্ট একটা বক্তব্য ছিল, তাকে কেউযেন সাংবাদিক না বলে। সে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে চিন্তাও করে না। এই হল আমাদের তাইজুদ্দিন।সোজা সাপ্টা সহজ সরল স্বীকারোক্তি। কোন ভনিতা করতে জানে না সে। তারসাথে কথা শেষ করার মধ্যে কুড়িগ্রাম থেকে আরও ৭/৮ জনের একটি টিম এল। সবাই আমার পরিচিত।তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নারায়ণপুরের সেই জিলাপীর দোকানে আবার সবাই মিলে দলবেঁধেজিলাপি খেলাম। এরপর সহকর্মী সাংবাদিকদের সাথে শেষ বিদায় জানিয়ে আমি আর মমিনুল বাবুকুড়িগ্রামের পথে রওয়ানা দিলাম। পথিমধ্যে মোবাইল দিয়ে কনটেন্ট পাঠানোর পর সাথে সাথেসেগুলো রিলিজ হল। আধাঘন্টার মধ্যে যারা নারায়ণপুরে আসতে পারেনি সেই সমস্ত সহকর্মীরাফোনের পর ফোন দিতে লাগল। যেহেতু তাইজুদ্দিন তখন সারা মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেছিল একারণে যারাই ভিডিও চাইল, তাদেরকেই সহযোগিতা করা হল। এর মাধ্যমে সকল চ্যানেলে তাইজুদ্দিনকেনিয়ে নিউজ আসা শুরু হলো। অনেকে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। পরদিন অবস্থা এমন দাঁড়ালযে প্রায় অর্ধশত সাংবাদিক ও ডিজিটাল ক্রিয়েটররা তাইজুদ্দিনের বাড়িতে হামলা করল। এখনপ্রতিদিন বাড়ছে তাইজুদ্দিনকে নিয়ে ভিডিও করার আগ্রহ ও প্রবণতা। এটাই স্বাভাবিক কিন্তুতাকে মিডিয়ার লোকজন যেভাবে তাইজুদ্দিনকে উপস্থাপন করতে চাইছেন সেটি অনেকেরই পছন্দ হচ্ছেনা। এছাড়াও তাইজুদ্দিনকে নিয়ে আমরা নানান রিল দেখছি। সবচেয়ে একটি রিলে দেখলাম তাইজুদ্দিনেরহাতে অনেক পুরস্কারের প্যাকেট এবং তার চিরাচরিত পেষাকেরও পরিবর্তন হয়েছে। সহজ সরল ছেলেটিকেহঠাৎ করেই যেন আমরা পাল্টানোর চেষ্টা করছি। তাকে সাহায্য পেতে আগ্রহী করে তুলছি। যদিওতাইজুদ্দিন দৃঢভাবে বলছিল, আমি আমার জন্য কোন সহযোগিতা চাইছি না। আমি চাইছি আমার এলাকারঅবহেলিত লোকদের জন্য সহযোগিতা। কিন্তু আমরা তার ভাষা কি বুঝতে পারছি। অনেক বড় বড় জায়গাথেকে তাইজুদ্দিনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে অনেক সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে আলোচনা করা হচ্ছে।জানি না এরফলে ঘটনা কোন দিকে মোড় নিবে। আমরাযেন মিডিয়ার মানুষরা সেই সহজ সরল ছেলেটিকে ক্রমান্বয়ে মাকড়সার জালের মধ্যে আটকানোরচেষ্টা করছি। তার সরলতা, স্বাতন্ত্রবোধ, তার বিশ্বাসকে আমরা হত্যা করতে চাইছি। তিনদিনআগে দেখা তাইজুদ্দিনকে আমি এখনেই চিনতে পারছি না। সামনে যে কি অপেক্ষা করছে জানি না।সেই আদি তাইজুদ্দিনকে মনে হয় আমরা হারাতে বসেছি!#
যোগাযোগ :
বাসা নং-১৯, ৫ম তলা, রোড-৭/এ,
ব্লক-বি, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা-১২১২
সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমা সুলতানা নীলা
মোবাইল: ০১৬২২৩৯৩৯৩৯
ইমেইল: nazmaneela@gmail.com