'প্রফেসর ড. আসিফ মিজান: আছিয়া থেকে রামিসা- এই নামগুলো এখন আর শুধু দুটি শিশুর নাম নয়; এরা বাংলাদেশের বিবেকহীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে একেকটি জ্বলন্ত অভিযোগপত্র। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান সাংবিধানিক দায় হলো তার সবচেয়ে দুর্বলতম ও সুরক্ষাহীন নাগরিককে রক্ষা করা। কিন্তু যখন শিশুদের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়, যখন তাদের করুণ কান্না সমাজের বধির কানে এসে আছড়ে পড়ে, আর রাষ্ট্র কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা শোকবার্তা দিয়েই নিজের দায়িত্ব সারে- তখন বুঝতে হবে, কেবল প্রচলিত আইনই অচল হয়নি, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিক চেতনা ও মনস্তত্ত্ব মারাত্মকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। প্রশ্ন জাগে, আছিয়া কিংবা রামিসার পর এবার কে? রাষ্ট্র কি তবে কেবল শোকবার্তাই লিখে যাবে?
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন আছে, বিশেষায়িত আদালত আছে, তদন্তের দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা আছে এবং রাজপথে ক্ষোভের প্রতিবাদও আছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো- এসবের কার্যকারিতা কোথায়? আইন যদি অপরাধীর জন্য কেবলই একটি কাগুজে বাঁধা হয়, আর ভুক্তভোগীর জন্য অনন্তকাল ধরে বিলম্বিত এক আশ্বাসের নাম হয়, তবে তাকে আর যাই বলা হোক, ‘ন্যায়বিচার’ বলা যায় না; সেটি কেবলই প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার এক নিষ্ঠুর তামাশা।
সাম্প্রতিক সময়ে পৃথক শিশু আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংশোধনী বিল পাসের মতো পদক্ষেপগুলো অবশ্যই কাগজে-কলমে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আইনি কাঠামো তখনই অর্থবহ হবে, যখন অপরাধের তদন্তের গতি, প্রমাণের নির্ভুলতা, বিচারকের দক্ষতা এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দ্রুত নিশ্চয়তা একসঙ্গে একটি সমন্বিত চক্র হিসেবে কাজ করবে। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় Deterrence বা অপরাধ দমনের মূল কথা ছিল শাস্তির ‘নিশ্চয়তা’; অথচ আমাদের বাস্তবতায় অপরাধীর শাস্তি পাওয়াটা অনেক সময় কেবলই একটি দূরবর্তী ‘সম্ভাবনা’। এই সম্ভাব্য শাস্তি অপরাধকে থামায় না, বরং অপরাধীর অপরাধ করার সাহস ও স্পর্ধাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও নির্মম সত্যটি হলো- অপরাধীরা শুধু অন্ধকার রাস্তাঘাটে ওৎ পেতে থাকে না, অনেক সময় তারা অবস্থান করে আমাদের অতি চেনা ও বিশ্বস্ত পরিসরে। পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়, এমনকি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানগুলোতেও শিশুরা আজ চরমভাবে অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। এটি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এটি একটি পচনশীল সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত লক্ষণ। শিশুর নিরাপত্তা যদি ঘরের ভেতরে কিংবা তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থলেই ভেঙে পড়ে, তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিরাপত্তা-দাবি কতটা ফাঁপা ও অন্তঃসারশূন্য- তা আর নতুন করে ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া কিংবা অতি সাম্প্রতিক ৭ বছরের শিশু রামিসার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- অপরাধ এখন আর কোনো ব্যতিক্রমী সামাজিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি পুনরাবৃত্তিমূলক, নির্মম এবং ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এক জাতীয় ব্যাধি।
> যে রাষ্ট্র শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের নীরবতা ক্ষমার অযোগ্য
এখানে বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বিশেষভাবে দায়ী। বহু ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তদন্তে ইচ্ছাকৃত বা গাফিলতিজনিত বিলম্ব, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, আধুনিক ফরেনসিক প্রমাণের দুর্বলতা, মামলা ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি এবং প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াকে বিকল করে দেয়। ফলে অপরাধী চক্র খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারে যে- আইনের জালে ধরা পড়লেও সময়ের ফাঁকফোকর আছে, প্রমাণের মধ্যে দুর্বলতা আছে, আর রাষ্ট্রের ক্ষোভের মধ্যেও সমঝোতার সুযোগ আছে। এই আইনি ও প্রশাসনিক ‘ফাঁকটাই’ অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।
বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে দুর্বল, দলীয়করণ, নিয়ন্ত্রিত এবং আস্থাহীন করা হয়েছে- সেই ঐতিহাসিক সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিভিল প্রশাসন, বিচারিক প্রক্রিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার- সবখানেই যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ধূলিসাৎ হয়ে কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক আনুগত্য বৃদ্ধি পায়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ‘Institutional Legitimacy’ বা প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে। আর রাষ্ট্রযন্ত্রের অঙ্গগুলো যখন নিজেই কাঠামোগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তখন নারী ও শিশু সুরক্ষা কেবলই সস্তা রাজনৈতিক স্লোগান ও ইশতেহারে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য। বিচারহীনতা, জবাবদিহির চরম অভাব, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার- এই তিনটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়া সমাজে এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নিপীড়নই হয়ে ওঠে বলশালীদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা।
এ কথা এখন আর গোপন নয় যে, শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে অনেক সময় অপরাধীরা শাস্তি পেলেও তা দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় পড়ে জনগণের চোখে দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক হয় না। আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলোতে সময়সীমা নির্ধারণ, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ভিকটিমের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে কথাগুলো এসেছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে সঠিক দিকের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আইনের অভিধান আর বাস্তব জীবনের অভিঘাত এক নয়। যদি জেলা পর্যায়ে প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত তদন্তকারী, শক্তিশালী ও আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব, ভিকটিম-সাপোর্ট সেল এবং জবাবদিহিমূলক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল না থাকে, তবে আইনের এই আধুনিক ভাষা কেবলই আইনি কেতাবে নীতিবাক্য হিসেবে বন্দী থাকবে।
আমাদের শিশুদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক সত্য হলো- আমাদের সমাজ খুব দ্রুত সবকিছু ভুলে যায়। একটি বীভৎস ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, মানববন্ধন হয়, সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়; কিন্তু কয়েকদিন পর যখন নতুন আরেকটি ট্র্যাজেডি বা রাজনৈতিক ইস্যু সামনে আসে, তখন আগের ঘটনাটি চিরতরে আড়ালে চলে যায়। এই ‘Collective Amnesia’ বা সামষ্টিক স্মৃতিভ্রমই হলো অপরাধী ও ধর্ষকদের সবচেয়ে বড় মিত্র। আজ আছিয়া, কাল রামিসা, পরশু আরেকটি অবোধ শিশুর নির্মম লাশ- এভাবে যদি একটি জাতি প্রতিটি ট্র্যাজেডিকে কেবলই দৈনিক কাগজের আলাদা আলাদা 'খবর' মনে করে ভুলে যেতে থাকে, তবে এই নারকীয় অপরাধচক্র থামবে কীভাবে? স্মৃতি যদি ধারাবাহিক প্রতিবাদে রূপ না নেয়, তবে সে স্মৃতি কেবলই এক নিষ্ফলা কান্না হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়।
তাই বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর কোনো কালক্ষেপণ নয়, প্রয়োজন তীক্ষ্ণ ও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় জবাব। এই পচন রুখতে অবিলম্বে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
১. ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার কাঠামো:
নারী ও শিশু নির্যাতনের সব গুরুতর মামলার জন্য সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের সময়নির্ধারিত দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের বিশেষ সেল গঠন করতে হবে।
২. জেলা পর্যায়ে আধুনিকায়ন:
প্রতিটি জেলায় স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যকর ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ও ভিকটিম-সাপোর্ট ইউনিট স্থাপন করা।
৩. বাধ্যতামূলক সেফটি প্রটোকল:
দেশের সকল স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক ও কঠোর 'সেফটি প্রটোকল' এবং সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা।
৫. সচেতনতা ও রিপোর্টিং চ্যানেল:
অভিভাবক, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য গুড টাচ-ব্যাড টাচ চেনার মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা, সহজ রিপোর্টিং চ্যানেল এবং সংকটকালীন জরুরি সেবা (যেমন হেল্পলাইন) বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৫. সাক্ষী সুরক্ষা আইন:
মামলা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সাক্ষীদের রাষ্ট্রীয় খরচে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করা।
এখানে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দেওয়ার জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠা করা কেবল সরকারের একক কাজ নয়; এটি প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা, অভিভাবক এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত সামাজিক দায়। আইনের শাসনকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত না করে, একে আমাদের সংস্থাগত ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। একটি শিশু হত্যার বিচার যখন দিনের পর দিন বিলম্বিত কিংবা তামাদি হয়ে যায়, তা শুধু একটি নির্দিষ্ট মামলার ব্যর্থতা নয়- তা আসলে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের চরিত্রগত ও কাঠামোগত ব্যর্থতা।
এখন সময় এসেছে সমস্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শোককে শক্ত নীতিতে, সাময়িক ক্ষোভকে স্থায়ী আইনি সংস্কারে, আর ফাঁপা প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়ার। রাষ্ট্র যদি এই ভয়াবহ সংকটের পরও নীরব বা উদাসীন থাকে, তবে সে রাষ্ট্র কেবল দুর্বলই নয়- সে নিজেই এই অপরাধের পরোক্ষ অংশীদার। আর যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্তনাদ শুনেও নড়েচড়ে বসে না, ইতিহাস তাকে কখনোই ক্ষমা করে না।
আছিয়া থেকে রামিসা- এই রক্তাক্ত তালিকায় যেন আর কোনো নতুন নাম যুক্ত না হয়। এই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়হীনতার অবসান এখনই হতে হবে।
লেখক :
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া।
যোগাযোগ :
বাসা নং-১৯, ৫ম তলা, রোড-৭/এ,
ব্লক-বি, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা-১২১২
সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমা সুলতানা নীলা
মোবাইল: ০১৬২২৩৯৩৯৩৯
ইমেইল: nazmaneela@gmail.com