যেকোনো প্রগতিশীল ও গণমুখী রাজনৈতিক দলের মূল চালিকাশক্তি বা "লাইফব্লাড" (Lifeblood) হলো তার মাঠপর্যায়ের কর্মীবাহিনী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এই কর্মীরাই হলেন দলের "গ্রাসরুট ক্যাডার' (Grassroots Cadres), যাঁরা রোদ-বৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, পুলিশের লাঠিচার্জ কিংবা রাজনৈতিক মামলার ঝুঁকি উপেক্ষা করে দলের আদর্শিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখেন। তবে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি গভীর কাঠামোগত বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—তা হলো রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের ক্রমাগত প্রান্তিকীকরণ (Marginalization) এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে হাইব্রিড' ও সুবিধাবাদী এলিটদের (Opportunistic Elites)
অনাকাঙ্ক্ষিত আধিপত্য। ত্যাগী কর্মীদের এই বঞ্চনাবোধ আজ কেবল ব্যক্তি-ক্ষোভ নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন।
ক্ষমতার সমীকরণ, অলিগার্কি এবং সুবিধাবাদের আগ্রাসনঃ
রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর যখনই ক্ষমতার রূপান্তর ঘটে, তখনই রবার্ট মিশেলসের বিখ্যাত তত্ত্ব "অলিগার্কির লৌহ বিধি" (Iron Law of Oligarchy)-র মতো একটি ক্ষুদ্র চাটুকার গোষ্ঠী পুরো দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন মূল্যায়নের মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, তখন দেখা যায় ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিচ্ছেন নেতার আত্মীয়স্বজন, বিত্তশালী কর্পোরেট তোষামোদকারী এবং হঠাৎ গজিয়ে ওঠা 'হাইব্রিড' নেতারা।
একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় *লিপ সার্ভিস পলিটিক্স' (Lip-service Politics) বা ক্লাইয়েন্টেলিজম' (Clientelism) বলা চলে, যেখানে মেধা ও ত্যাগের চেয়ে আনুগত্য এবং চাটুকারিতাকে বেশি পুরস্কৃত করা হয়। রাজপথের কর্মীরা যে ফসল নিজেদের রক্ত, ঘাম ও যৌবনের বিনিময়ে ফলিয়েছেন, তা আজ একদল সুবিধাবাদী 'পলিটিক্যাল প্যারাসাইট' বা রাজনৈতিক পরজীবীর ভোগবিলাসের উপাদানে পরিণত হয়েছে। মাঠের কর্মীরা যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কেবল একটি আলোকচিত্র (Photo-op) ধারণ করেই সান্ত্বনা খোঁজেন, সেখানে সেই ছবিটিকে পুঁজি করে ড্রয়িংরুমের নেতারা নিজেদের ব্যক্তিগত আখের গোছান। এই চরম বৈষম্য রাজনীতিকে আদর্শহীনতা ও ডি-আইডিওলজাইজেশন (De-ideologization)*-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
"কায়দা করে বেঁচে থাকা" এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংগ্রামঃ
বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করা একটি গ্রাফিতি—"কায়দা করে বেঁচে থাকো"—আজকের দিনেও মাঠের অবমূল্যায়িত কর্মীদের জন্য এক নির্মম অস্তিত্ববাদী সত্য (Existential Truth)। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর "বায়োপলিটিক্স' (Biopolitics)তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন রাষ্ট্র বা দলীয় কাঠামো কোনো ব্যক্তির কণ্ঠরোধ করতে চায়, তখন টিকে থাকাই হয়ে ওঠে প্রধান প্রতিরোধ।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যাঁরা 'ক্রোনিজমে' (Cronyism) বিশ্বাস করেন না, যাঁরা পদলেহন করতে পারেন না এবং নিজের আত্মসম্মান বা ডিগনিটি' (Dignity) বিক্রি করতে জানেন না, তাঁদের জন্য রাজপথের ত্যাগের মূল্য যেন কর্পোরেট রাজনীতির বাজারে সস্তা হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে চাটুকারিতার মাধ্যমে মূল্যায়িত হওয়ার চেয়ে সাময়িকভাবে অন্তরালে বা 'রাজনৈতিক হাইবারনেশনে' (Political Hibernation) থাকাই শ্রেয়। মেরুদণ্ড সোজা রেখে, কায়দা করে টিকে থাকাই এখন প্রকৃত আদর্শবাদীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপ্লব।
কৌশলগত উপযোগিতা বনাম চাটুকারিতার বৃত্তঃ
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, দল যখন সংকটে পড়ে কিংবা কোনো তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি হয়, তখনই কেবল মাঠের কর্মীদের খোঁজ পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ইউটিলিটারিয়ান এক্সপ্লোইটেশন' (Utilitarian Exploitation) বা উপযোগিতাবাদী শোষণ। সংকট কেটে গেলেই ড্রয়িংরুমের চাটুকাররা আবার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় এবং ত্যাগীদের পেছনে ঠেলে দেয়।
তাই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজপথের আন্দোলন ও রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিকে এমন এক স্তরে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে কেবল তদবির বা অর্থকড়ি দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। যখনই রাজনৈতিক অঙ্গন আবার উত্তপ্ত হবে, তখনই নেতৃত্বের 'ট্যাকটিক্যাল রিয়ালাইজেশন' বা কৌশলগত বোধোদয় ঘটবে যে—আত্মীয়স্বজন বা হাইব্রিড চাটুকারদের দিয়ে রাজনীতির বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয়; রাজপথের ঝড় সামলাতে রাজপথের সৈনিকদেরই প্রয়োজন।
মেধা ও যোগ্যতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
একটি বিকল্প দৃষ্টান্ত
রাজনীতি কেবল অন্ধ স্লোগান আর অন্ধ আনুগত্যের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নয়। মেধা, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঠিক সমন্বয় ঘটলে রাজপথের একজন কর্মীও যে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে পারে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। প্রতিকূল ঘরোয়া রাজনীতি থেকে দূরে গিয়ে, সম্পূর্ণ নিজের মেধা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যখন একজন বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে—যেমন সোমালিয়ার দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে উপাচার্য (Vice-Chancellor) পদের গৌরব অর্জন করেন, তখন তা প্রমাণ করে যে মেধার বৈশ্বিক চাহিদা কতটা অনস্বীকার্য।
এটি একটি তাত্ত্বিক বার্তা দেয়: মেরিটকার্ড বা মেধার রাজনীতি" (Meritocracy)
যদি চর্চা করা হয়, তবে মাঠের কর্মীরা কেবল দল নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে সক্ষম। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নিজ দেশের অভ্যন্তরে যখন লড়াকু সৈনিকদের ভাগ্যাকাশে বঞ্চনার মেঘ জমতে দেখা যায় আর হাইব্রিডদের জীবনে আলোর ঝলকানি দেখা যায়, তখন তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করে তোলে।
একটি সুস্থ, গতিশীল এবং টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থার (Sustainable Political System) প্রধান শর্ত হলো মেধা, ত্যাগ ও শ্রমের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন। চাটুকারিতা, স্বজনপ্রীতি এবং 'নেপোটিজম' (Nepotism)-এর বলয় থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে না পারলে মাঠের কর্মীরা চিরকালই ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন। সময় এসেছে রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের জেগে ওঠার—তবে তা কোনো অন্ধ আনুগত্যের চাদরে আবৃত হয়ে নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার যৌক্তিক লড়াইয়ে। মেধা, নৈতিকতা ও ত্যাগের মেলবন্ধনেই কেবল রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনা সম্ভব, অন্যথায় "কায়দা করে বেঁচে থাকা"র এই দীর্ঘশ্বাস রাজনৈতিক ইতিহাসকে কেবলই কলঙ্কিত করবে।
— প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া।
যোগাযোগ :
বাসা নং-১৯, ৫ম তলা, রোড-৭/এ,
ব্লক-বি, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা-১২১২
সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমা সুলতানা নীলা
মোবাইল: ০১৬২২৩৯৩৯৩৯
ইমেইল: nazmaneela@gmail.com