স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছেন ২২ জন রাষ্ট্রপতি। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ, সেনা কর্মকর্তা, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আমলা রয়েছেন। কেউ এসেছেন গণরায়ের পথ ধরে, কেউ অভ্যুত্থানের পটভূমিতে, কেউ জাতীয় সংকটের মুহূর্তে। কিন্তু বিদায়ের সময় অধিকাংশের সঙ্গেই থেকেছে কোনো না কোনো বিতর্ক। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভবন (বঙ্গভবন) একই সঙ্গে গৌরব, বিতর্ক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ইতিহাস। এটি ক্ষমতার পালাবদল, সংবিধানের বিবর্তন, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের উত্থান-পতন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও এক জীবন্ত দলিল।
মোটা দাগে এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে চারটি বিষয়। এগুলো হলো- ব্যক্তি হিসাবে রাষ্ট্রপতির চরিত্র, ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব পালনকালে তার কার্যক্রম এবং সবশেষ রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তার নিরপেক্ষতা। ২২ জনের মধ্যে মাত্র চারজন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছেন। বাকি ১৭ জনের মধ্যে কেউ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন অথবা ক্ষমতায় থাকাকালে মারা গেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত কে এ মূল্যায়নের সঙ্গে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জড়িত। নিরপেক্ষ জায়গা থেকে এর গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন কঠিন।
সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে বিতর্ক : দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত রাষ্ট্রপতির তালিকায় রয়েছেন সদ্য পদত্যাগী মো. সাহাবুদ্দিন। শুরুটা তার নিয়োগ নিয়ে। কারণ তিনি দ্বৈত নাগরিক। মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকত্ব রয়েছে তার। এ রকম একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া সংবিধান সম্মত ছিল না। এছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার, কলঙ্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের স্বার্থরক্ষা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে থাকাকালে দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক ব্যবসায়ীর ফাইল গায়েব করে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতা ধরে রাখতে পুতুল ব্যক্তি হিসাবে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে ২০২৩ সালে সাহাবুদ্দিনকে একক সিদ্ধান্তে নির্বাচিত করেন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে সমালোচনায় পড়েন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার কিছু বক্তব্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন।
খন্দকার মোশতাক : আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও কলঙ্কিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক। আওয়ামী লীগের দাবি-১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডে জড়িত। হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে তিনি ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেন। এ কারণে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ : ১৯৮২ সালে দায়িত্ব নেওয়া তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে স্বৈরশাসক শব্দটি জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের প্রতীক তিনি। সামরিক আইন জারি, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন, প্রশাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে কারাবন্দি হন তিনি। ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে এরশাদের বড় ভূমিকা ছিল। শেষদিকে রাজনীতিতে এরশাদ একটি কমেডিয়ান চরিত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। যে কোনো ইস্যুতে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিনোদনের খোরাক ছিল।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ : ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০০৬-২০০৭ সালে দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির জন্য তার বিতর্কিত ভূমিকা সবচেয়ে বেশি দায়ী। দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচ্যুতি ঘটানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অন্যতম। বিতর্কিত ভূমিকার জন্য বহুল আলোচিত-সমালোচিত ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি হয়। এ ওয়ান-ইলেভেনকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় বলা হয়।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী : ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। রাজনৈতিক বিরোধে তার বিদায় হয়। বিএনপির একটি অংশ অভিযোগ তোলে, তিনি দলীয় প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করেননি। বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের মাজারে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। শেষপর্যন্ত তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।
কম বিতর্কে যারা : দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। সততা, সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন তিনি। এছাড়া বিধ্বস্ত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। এরপর অন্যতম সফল রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ১৯৯০ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নির্লোভ চরিত্র, সৎ ও সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্য সমাদৃত তিনি। তার সময়ে দুটি নির্বাচনই তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের বিবেচনায় তিনি বিশ্বাসঘাতক। এছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালে কম বিতর্কে ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার সময়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। যদিও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। এছাড়া আবু সাঈদ চৌধুরীকে নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই।
রাষ্ট্রপতিদের সময়কাল : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ওই বছরের ১২ জানুয়ারি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হলে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদউল্লাহ। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ৬ নভেম্বর তিনি ক্ষমতা হারান। পরে দায়িত্ব পান প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। তিনি পদত্যাগ করলে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৮ সালে নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। এরপর আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরশাদ প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বিতর্কিত নির্বাচনে ১৯৮৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ১৯৯১ সালে আবার সংসদীয় সরকার চালু হলে তিনি প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। আর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি হিসাবে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আবারও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান সাহাবুদ্দীন আহমদ। মেয়াদ শেষে তিনি ২০০১ সালে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ২০০১ সালে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন। তবে রাজনৈতিক বিরোধে ২০০২ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। ওই বছর তার স্থলাভিষিক্ত হন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. জিল্লুর রহমান। দায়িত্বে থাকাকালে ২০১৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. আবদুল হামিদ। তিনি ২০১৩ সালে প্রথমবার এবং ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে টানা দুই মেয়াদে প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। অসুস্থার কারণ দেখিয়ে ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
যোগাযোগ :
বাসা নং-১৯, ৫ম তলা, রোড-৭/এ,
ব্লক-বি, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা-১২১২
সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমা সুলতানা নীলা
মোবাইল: ০১৬২২৩৯৩৯৩৯
ইমেইল: nazmaneela@gmail.com