
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। এর ফলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তবে নির্বাচনের এই ফলেও বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট কাটেনি।
ট্রাম্পের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ও নেতারা মার্কিন নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানালেও ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান।
লন্ডনের একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জো রিভও নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রথমে আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশাবাদ দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দ্রুত ও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা এখন বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছে। দেশটি মুহূর্তের মধ্যে অবস্থান বদলে অন্যদের হতাশ করতে পারে।
রিভ বলেন, ‘সবাই এখন যা শিখেছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থায় এমন নাটকীয় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। আমরা এখন জানি, যুক্তরাষ্ট্র মুহূর্তের মধ্যে অবস্থান বদলে আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে।’
নির্বাচনের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে বার্তা সংস্থা এপি। দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়ংগিন শহরের ৪৯ বছর বয়সি চাকরিজীবী কিম সো-জুং বলেন, ‘শুধু একটি নির্বাচনেই সবকিছু ফিরে আসে না। যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী করে, তা আমাদের দেখতে হবে। আস্থা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে তারা ভিন্ন কিছু করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।’
এখন কী হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পক্ষে ৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন নাগরিকের ভোট, তার প্রশাসনের শুল্কযুদ্ধ, গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড, অভিবাসননীতি ও ইরানবিষয়ক অবস্থান—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের নেতারা ও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্পের হাতে এখনো ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ভোটের ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর বলেন, ‘সত্যি বলতে, গত দুই বছর ট্রাম্প অনেকটাই কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। এখন কেন তার পরিবর্তন হবে?’
নির্বাচনে বড় ধাক্কা খাওয়ার আগে ও পরে ট্রাম্পের উদাসীন মনোভাব এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ততা তার শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারেন এবং তার সিদ্ধান্ত আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার ‘থিংক চায়না’তে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবার ফিরে এসেছে কি না, সেটি দেশটির মিত্রদের কাছে মূল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কোন অবস্থানে ফিরছে এবং কত দিন সেই অবস্থানে থাকবে?’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফল বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা নীতিগুলো পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখা অনেক মানুষের আশাতেও এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ বিশ্ববাজার ও অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তিনি লাখ লাখ মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা বন্ধ করেছেন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছেন। তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি সহিংস ও প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। ফলে অনেকের কাছেই দেশটি এখন এড়িয়ে চলার মতো একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের নীতিতে নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। শুক্রবার তিনি তার দীর্ঘদিনের সহযোগী স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হওয়া মিলার ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির অন্যতম প্রধান রূপকার।
কানাডার সংবাদমাধ্যম রিডদ্যলাইন ডটসিএর সম্পাদক জেন গারসন বলেন, ‘আমি মনে করি না সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সব মিত্রের জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে থাকা উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিভিন্ন দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান সিনেটিকার একজন ব্যবসা উন্নয়ন ব্যবস্থাপক এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার যোগ্যাকার্তার বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সি আদিত্য সুরিয়া এপিকে বলেন, ‘আমার কাছে আস্থা ফিরে পাওয়ার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে ধারাবাহিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। নির্বাচন একটি ভালো সূচনা। তবে এরপর কী ঘটে, সেটিই আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
আস্থা ফেরানোর বড় পরীক্ষা শুল্কনীতি প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাটরা প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় ট্রাম্পের ব্যয়বহুল শুল্কনীতি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারা সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং ট্রাম্প প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো মেনে নেন, নাকি ভেটো দেন—এখন সেদিকেই নজর রাখছেন অনেকে।
অস্ট্রেলিয়ার গরুর মাংস উৎপাদনকারী হ্যামিশ ম্যাকইনটায়ার অবশ্য এ বিষয়ে আশাবাদী নন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বসন্তকালীন ফসল সংগ্রহের মৌসুম চলার মধ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেলের দাম বেড়ে গেছে। এতে কৃষকরা সংকটে পড়েছেন। সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বড় খামারগুলোর মুনাফা ৩৯ শতাংশ কমে যেতে পারে।
কৃষি খাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন ন্যাশনাল ফার্মার্স ফেডারেশনের সভাপতি ম্যাকইনটায়ার বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিজে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির গতিপথে মৌলিক পরিবর্তন আনবে, এমন সম্ভাবনা কম।’ তার মতে, এই নির্বাচনের ফল প্রশাসনকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা থেকেও বিরত রাখতে পারবে না।
সুইজারল্যান্ডের ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব রোমান্ডি এন্টারপ্রাইজেসের সভাপতি ইভান স্লাটকিনে বলেন, নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরেছে। এতে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের সরল হওয়া চলবে না। আমেরিকা ফার্স্ট ধারণা শিগগিরই পরিত্যক্ত হবে না। প্রেসিডেন্টের নেওয়া সব সিদ্ধান্ত নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠরা পাল্টে দেবে বলেও আমি মনে করি না।’
হংকংয়ের ব্যবসায়ী ড্যানি লাও অবশ্য নির্বাচনের ফলে কিছুটা আশার আলো দেখছেন। দক্ষিণ চীনের দংগুয়ানে তার অ্যালুমিনিয়াম আবরণ তৈরির কারখানায় আসা মোট ক্রয়াদেশের ৩০ শতাংশের বেশি আসে মার্কিন গ্রাহকদের কাছ থেকে। তবে তার ব্যবসায় প্রায় ৮১ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।
লাও বলেন, ‘ট্রাম্পই শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছেন। এখন তার প্রভাব কমে গেলে শুল্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসবে কি? অন্তত আশা করি, তিনি আর শুল্ক বাড়াবেন না।’
দক্ষিণ চীনের উপহারসামগ্রীর বাক্স প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্সবক্সের প্রধান নির্বাহী মাইকেল লু বলেন, বিশেষ করে চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের আগের বাণিজ্যযুদ্ধের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো অনেক বেশি। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যে দলই জিতুক না কেন, চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামগ্রিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যবসার প্রায় ২০ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
জাপানের ব্যবসায়ী সংগঠন কেইদানরেনের চেয়ারম্যান ইয়োশিনোবু সুতসুই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে জোট ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা জাপানের জন্য অপরিহার্য। তার মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।
অনেকের কাছে এখনো অধরা ‘আমেরিকান স্বপ্ন’
ভারতের নাগরিক আম্বিকা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বর্তমানে দেশটিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেন। তবে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতি এবং গ্রিনকার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ তাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। পরিচয় গোপন রাখতে তিনি শুধু নিজের শেষ নাম প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ভারতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভিসানীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী আমাদের মতো মানুষের জন্য কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনবে কি না, তা আমি জানি না।’
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তন বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় দেশটির নির্বাচন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এবারের নির্বাচনে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার মার্টিন ম্যাকসুইনি নির্বাচনের পরদিন বলেন, ‘বারবার আমাদের সামনে পরিবর্তনের সুযোগ আসে। কিন্তু লোভের কারণে বিজয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে পরাজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এবার কি পরিস্থিতি ভিন্ন হবে? সেটি নির্ভর করছে মার্কিন জনগণের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতার কারণে বিষয়টি আমাকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলছে।’ সূত্র: এপি
যোগাযোগ :
বাসা নং-১৯, ৫ম তলা, রোড-৭/এ,
ব্লক-বি, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা-১২১২
সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমা সুলতানা নীলা
মোবাইল: ০১৬২২৩৯৩৯৩৯
ইমেইল: nazmaneela@gmail.com