• আজ ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পরীমনিরা প্রীতিলতা হয়ে আলো জ্বালুক ঘরে ঘরে

নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি

মুক্তির আগেই ২৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন পরীমনি। এরপর একের পর এক সাফল্য ধরা দিয়েছে স্রোতের মত। থমকে যাওয়ার সময় পেরিয়ে পরীমনি হয়ে উঠেন মিডিয়া জগতের অনন্য চরিত্র। যেখানেই যান আলোচনা লেগেই থাকে। একসময় জায়গা করে নেন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বসে। এশিয়ার ৩০ জনের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করেন অতি অল্প সময়েই।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি পরিমনিকে। শাহ আলম মন্ডল পরিচালিত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র। কিন্তু তিনি আলোচনায় আসেন নজরুল ইসলাম খানের ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর থেকে। পরীমনি আবার নতুন করে আলোচনায় আসেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী চরিত্র প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নাম ভূমিকায় এক চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হয়ে।

এটাতো গেল পরীমনির মিডিয়া জীবনের গল্প। হঠাৎ গল্প মোড় নিল অন্যদিকে। এইতো গেল মাস দুয়েক আগে খবর চাউড় হতেও দেরি হয়নি পরীমনি ইস্যুতে। একে তো সবসময়ই থাকেন আলোচনায়। কখনও নানা কারণে আম সমাজে তাকে নিয়ে চলে তর্ক যুদ্ধ। এসবের মাঝে নিজেই ১৩ জুন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দেন তাকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে তাকে। পরে নিজের বাসায় গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিস্তারিত জানান।

সে ঘটনার মূল হোতা নাসির ইউ মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি। উত্তরা বোট ক্লাব নামে এক ক্লাবের সাবেক সভাপতি তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী। পরিমনির দাবী ঘটনার দিন রাত ১২টার পর পরিচিতজনদের নিয়ে ওই ক্লাবে যান পরীমনি। সেদিন চারজন মদ্যপ ব্যক্তি পরীমনিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। এক পর্যায়ে একজন তাকে নেশাদ্রব্য খাইয়ে ধর্ষণের চেষ্টাও করে তারা। ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার করেন পরীমণি। অবশেষে সেই ঘটনায় অভিযোগে করা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়। গল্পে আসে নতুন মোড়।

তবে আমি গাণিতিক সূত্র কিংবা টেলিভিশনের কোনো থ্রিলার সিরিজের গল্প বলবো না। বড়জোর উল্লেখযোগ্য কিছু তারিখ মিলিয়ে নিতে পারি। পরীমনি ১৩ জুন সাভার থানায় নাসির ইউ আহমেদের নামে মামলা দায়ের করেন। পরে ঐ মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে নাসির ইউ আহমেদ জামিনও পেয়ে যান।

এর পরের ঘটনা বিরতিহীন অভিযানের মত।

বোট ক্লাবের ঘটনার পরেই নজরে আসে ডজন কয়েক মডেল যারা মাদকের সাথে জড়িত। ১ আগস্ট মডেল পিয়াসাকে মাদকের অভিযোগে গ্রেফতার করে র‍্যাব। পিয়াসার দেওয়া তথ্য মতে মডেল মৌও গ্রেফতার হয়। শুরু হয় মিডিয়পাড়ায় মডেল ও উঠতি অভিনেতাদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক। এরপর পরীমনির লাইভ অভিযুক্ত মডেলদের সর্বশেষ সংযোজন।

৪ঠা আগস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় র‌্যাবের অভিযান শেষে বাসায় অনুমোদনহীন মিনিবার পরিচালনা ও মাদকদ্রব্য রাখার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। পরীমনিকে আটক করার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় দুই দফায় ছয় দিনের রিমান্ড শেষে পরীমনিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

এর পর আসি পরীমনিকে নিয়ে কমেন্ট যোদ্ধাদের মন্তব্যে। তারা পরীমনিকে নানা বিরুপ মন্তব্য করছেন। কেউ বলছেন পরীমনি খুব ভয়ংকর অপরাধী তাকে যেন ছাড় না দেওয়া হয়। আবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে পরীমনি কোনো ভয়ংকর অপরাধী না। তাকে যেন মুক্তি দেওয়া হয় তাই চায়। পরীমনির পক্ষে কথা বলতে দেখা যায় শাকিব খান, আসিফ আকবর, মিথিলা, তসলিমা নাসরিনসহ আরও অনেকেই। পরীমনির পক্ষে আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ও ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবী মুজিবর রহমান অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান তিন সহকারী আইনজীবীর একজন আমান রেজা। তিনি একইসাথে একজন চলচ্চিত্র কর্মীও।

এখন দেখার বিষয় আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে পরীমনি কি বিচার পান বা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে কি শাস্তি দেওয়া হয়।

পরীমনিকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। বেশির ভাগ লোকই তাকে অপরাধী বলছেন। আসলেই কি সব দোষ তার একার? আমি বলছি না সে নিরপরাধ। বিভিন্ন সময়ে নিজেদের প্রয়োজনে কিছু লোক এই পরীমনিদের তৈরী করে। আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের স্থান হয় কাশিমপুর কারাগারে কিংবা পদবী হয় রাতের রাণী! আর ঐ সব লোকগুলো থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। তাদের কেউ কেউতো এই রাতের রাণী!দের বিরুদ্ধে বক্তব্যও দেয়। কিন্তু পুরুষশাসিত এই সমাজ শুধু বারবারই পরীমনিদেরই অপরাধী মনে করে। আমি একজন মেয়ে হিসেবে মনে করি তার এসব কর্মকাণ্ডের জন্য সে একা দায়ী নয়।

অভিভাবকহীন ভাবে বেড়ে উঠা খুব কষ্টের খুব যন্ত্রণার। সঠিক গাইডলাইন না পেলে একটা মেয়ে ভালো বা খারাপ পথের মাঝে পার্থক্য খুঁজে নাও পেতে পারে। তাই বলে সে জঘন্যতম অপরাধী না। সে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার কাউন্সিলিং প্রয়োজন। পরীমনিকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। আমি মনে করি তাকে মুক্তি দেওয়া দরকার। আবার যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে আমাদের ভালো ভালো সিনেমা উপহার দিতে পারে। সেই সাথে এইসব ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হোক।

দিন শেষে এই পরীমনিরা প্রীতিলতা হয়ে আলো জ্বালুক ঘরে ঘরে।

লেখক:

নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি

গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থী

পিএন/এফএইচপি

, , ,

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন পিপলস নিউজ‘এ । আজই পাঠিয়ে দিন feature.peoples@gmail.com মেইলে