ঢাকা, ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শরীয়তপুরের ডা. গোলাম মাওলা: চিরস্মরণীয় এক ভাষা সৈনিক

প্রকাশিত: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০ ৮:৫৫ অপরাহ্ণ  

| ইয়ামিন কাদের নিলয়, বিশেষ সংবাদদাতা শরীয়তপুর

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অনুপ্রেরণা হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। ভাষা সৈনিক হিসেবে দেশের অনেকেরই অবদান রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম একজন ডা. গোলাম মাওলা। ভাষা আন্দোলনে তার অবদান চিরস্মরণীয় ও অনস্বীকার্য।

তিনি বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উজ্জ্বল তারকা এবং নীতি নৈতিকতার আদর্শের প্রাণ পুরুষ। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্যু সেই সংগ্রামে অবিচল থেকে বলে গেছেন শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজের কথা।

তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনকারীদের স্তব্ধ করে দিতে যে স্থানটিতে গুলি করা হয়েছিল ঠিক সে স্থানটিতেই তার নির্দেশনায় নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার।

তিনি ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৪১ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৪৩ সালে বিএসসি শেষ করেন। ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিদ্যায় এমএসসি শেষে ১৯৪৬ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি এবং ১৯৫৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতিতে অবদান রাখেন।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শৃঙ্খলিত মানুষের আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বীভৎস চেহারা, দেশবিভাগের পর স্ব-দেশত্যাগী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, শাসক শ্রেণির নিপীড়ন-অত্যাচার তাকে একজন মানবতাবাদী, আপসহীন নির্লোভ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে তাড়িত করে।

১৯৫২ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ডা. গোলাম মাওলার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় যে চারজন ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ডা. গোলাম মাওলা অন্যতম।

২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর সেদিন রাত ৯টায় মেডিক্যাল কলেজ ব্যারাকে ডা. আজমলের কোয়ার্টারে কর্মীদের যে সভা হয় সেখানে সভাপতিত্ব করেন ডা. গোলাম মাওলা। ওই সভায় ডা. গোলাম মাওলাকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ পুনর্গঠিত হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ডা. গোলাম মাওলার কথামতো ডা. বদরুল আলমের (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেধাবী ছাত্র) স্কেচ (ডিজাইন) অনুযায়ী হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে ডা. গোলাম মাওলা নিজে ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. এসডি আহমেদসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যে স্থানটিতে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল সে স্থানটিতে নিজেরাই নির্মাণ করেন প্রথম শহীদ মিনার।

যদিও শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ভেঙে গুঁড়িয়ে ভিতসহ উপড়ে ফেলে গর্তে মাটি ভরাট করে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।

তিনি ছাত্রজীবন শেষে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত এবং ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৫২ সালে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত তার সাংগঠনিক কার্যতৎপরটা, সততা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সিদ্ধান্তে অটল থাকার অঙ্গীকার ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

অকুতোভয় এই সংগ্রামী নেতা ১৯৬৭ সালের ২৯ মে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস ও মতামত কলামে লিখতে পারেন আপনিও – Peoplesnews24.com@gmail.com ইমেইল করুন  

সর্বশেষ

জনপ্রিয় সংবাদ