ঢাকা, ২৬শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শ্রীকৃষ্ণের সত্য জীবনাদর্শন

প্রকাশিত: সোমবার, মার্চ ২, ২০২০ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ  

| উজ্জল রায়, নড়াইল

রাধা কে বৈষ্ণব তত্ত্ব মতে ঈশ্বর সাধন রসতাত্ত্বিকভাবে পাঁচ রকম। যথা- শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। উক্ত পাঁচ পন্থার মধ্যে মধুর রস ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই রস সাধনার মূলকথা ঈশ্বর এক পরমপুরুষ আর সৃষ্টির সকল কিছুই নারী। সকল নারী প্রবল ভাবাবেগ ও ভালোবাসার টানে ধাবিত হচ্ছে পুরুষের দিকে। আর এই প্রকৃতিরূপ জীবাত্মারূপী নারীর প্রতীক হিসেবে বৈষ্ণব সাধকগণ রাধা চরিত্রটি কল্পনা করেছেন অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমপুরুষ বলেছেন। একজন পরমাত্মা (কৃষ্ণ) অন্যজন জীবাত্মা (রাধা)।

জানান, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মিলনই হলো এই তত্ত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়। নারী ও পুরুষের ভালোবাসার তীব্র ভাবাবেগ দিয়ে বৈষ্ণব সাধকগণ স্রষ্টার প্রতি অপরিসীম আকুতি প্রকাশ করেছেন। এই সাধনায় মধ্যযুগের কবি সাহিত্যিক তৈরি করেছেন শ্রেষ্ঠ সব সাধন গান ও কবিতা যা বৈষ্ণব পদাবলি নামে পরিচিত। স্বভাবতই এতে নারী-পুরুষের মিলনকে রূপকার্থে জীবাত্মা ও পরামাত্মার মিলনকেই বোঝানো হয়েছে। এমনকি ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসায় কোনো লজ্জা ও পিছুটান যাতে না থাকা তা বোঝাতে প্রেমিকা রাধাকে ব্যভিচারিণীরূপেও কবিগণ দেখিয়েছেন। বৈষ্ণব পদাবলির রাধা সমাজ চক্ষুকে উপেক্ষা করে কৃষ্ণের সাথে মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ স্রষ্টার প্রতি অনন্য ভক্তি সম্পন্ন মানুষ সব মায়া, মোহ ও সমাজ বন্ধনকে পাশ কাটিয়ে স্রষ্টার প্রেমে মাতোয়ারা হয়েছে।
কিন্তু এই উন্নত ও অধিক গভীর তত্ত্ব ধীরে ধীরে রক্ত-মাংসের চরিত্র রাধাতে রূপ নিয়েছে।
পাশাপাশি বহু ভণ্ড সাধকদের হাতে পড়ে রাধা তত্ত্বটি হয়েছে কলঙ্কিত। এমনকি বৈষ্ণব পদাবলির কবি- চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, বিদ্যাপতি সকলে রাধার যে ছবিটি একেছেন তা মূলত তাদের চারিপাশে ঘটে যাওয়া নারীর উন্মত্ত প্রেমিক রূপ। কখনো কখনো নিজের প্রেমিক রূপই এখানে ফুটে উঠেছে।
একারণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপযুক্ত প্রশ্নটি বৈষ্ণব কবিদের প্রতি করেছিলেন তাঁর সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের বৈষ্ণব কবিতা শীর্ষক কবিতায়…
সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি,
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান বিরহ-তাপিত।
হেরি কাহার নয়ান, রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?
বিজন বসন্তরাতে মিলনশয়নে কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহুডোরে,
আপনার হৃদয়ের অগাধ সাগরে রেখেছিল মগ্ন করি!
এত প্রেমকথা– রাধিকার চিত্তদীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা চুরি করি লইয়াছ কার মুখ,
কার আঁখি হতে! আজ তার নাহি অধিকার সে সংগীতে!
তারি নারীহৃদয়-সঞ্চিত তার ভাষা হতে তারে করিবে বঞ্চিত চিরদিন!

কৃষ্ণ চরিত্র নিয়ে গালগল্প তৈরিতে যে দুটি গ্রন্থ অধিক ভূমিকা রেখেছে তা হলো —
১) ব্রহ্মবৈবর্ত্য পুরাণ
২) বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন)। বঙ্কিমচন্দ্রসহ অনেক সমালোচকওই ব্রহ্মবৈবর্ত্য পুরাণকে অর্বাচীন, আধুনিক ও জাল পুরাণ বলেছেন। আর এই পুরাণের বহু বিভ্রান্তিকর তথ্য বিদ্যমান। যেমন এই পুরাণ মতে রাধ ও কৃষ্ণ দুজন বিবাহিত দম্পতি। আরও অবাক করার মতো কথা হলো স্বয়ং ব্রহ্মা তাদের বিয়ে দিয়েছেন। ব্রহ্মবৈবর্ত্য পুরাণ মতে রাধার উৎপত্তি কৃষ্ণের বাহু থেকে, ভাগবত মতে রাধার মাতপিতা যথাক্রমে বৃষভানু ও কমলাবতী আর বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য মতে পদ্মা ও সাগর। এইসব বিভ্রান্তিকর তথ্য চরিত্রটির বাস্তব অস্তিত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন ও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন বেচারা বড়ু চণ্ডীদাসের প্রতি তিনি রাধা চরিত্র দিয়ে কৃষ্ণকে কলঙ্কিত করেছেন। কিন্তু তারও বহু আগে থেকে রাধা চরিত্র সাহিত্যে পাকা স্থান করে নিয়েছিলো। সাতবাহন নরপতি হাল কর্তৃক গাথাসপ্তশতী সঙ্কলনে রাধার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় । ধারণা করা হয় এইট খ্রিস্টিয় ১ম শতক থেকে ৬ষ্ঠ শতকের মধ্যে লেখা হয়েছে। ভারতের আরও বহু সাহিত্যে রাধা চরিত্রের উল্লেখ আছে। তাই এই রাধা চরিত্র যতখানি না ধর্মের সাথে জড়িত তার থেকেও বেশি সাহিত্যের সাথে জড়িয়ে আছে।
এখন প্রশ্ন হলো কেন রাধাকে ভগবান কৃষ্ণের সাথে জুড়ে দেয়া হলো?
কারণ লোক মুখে প্রচলিত রাধার ব্যাকুল প্রেম কাহিনি বৈষ্ণব মধুর রসকে কেন্দ্র করে জীবাত্মা-পরামাত্মার সম্পর্ক বুঝানো। দ্বিতীয়ত মধ্যযুগের সাহিত্য ছিলো ধর্ম নির্ভর। সাহিত্যের মধ্যে ধর্মের আচ না থাকলে তা সাহিত্য দরবারে অচল। তাই এর মধ্যে ধর্মীয় আবহ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে শাক্ত-শৈব দ্বন্দ্ব আমাদের কাছে অবিদিত নয়। বড়ু চণ্ডীদাস নামে চণ্ডীর দাস আর তিনি যদি বর্ণনা করেন কৃষ্ণ চরিত্র তবে তা মধ্যযুগের পারস্পারিক বিদ্বেষকে জিইয়ে রাখতে কৃষ্ণ চরিত্রকে বিকৃত করে উপস্থাপন করতেই পারেন। এই পারস্পারিক বিদ্বেষ আজও দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো চণ্ডীদাস সমস্যা। বলে রাখা ভালো- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই বহুল প্রচলিত বাক্যটি বড়ু চণ্ডীদাসের নয় বরং চণ্ডীদাসের। এই দুজন এক ব্যক্তি নন। বাংলা সাহিত্যে মোটামুটি কয়েকজন চণ্ডীদাসের নাম পাওয়া যায় – বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস। যখন শ্রীচৈতন্য চণ্ডীদাসের পদ চর্চা করতেন আর ১৯১৬ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বৎবল্লভ যখন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ আবিষ্কার করলেন তখন গবেষকদের টনক নড়লো। চৈতন্যদেব এত বড়ো সাধক তিনি কি করে অশ্লীল ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য চর্চা করতে পারেন! তখন গবেষণায় দেখা গেলো চণ্ডীদাস যিনি পদাবলী সাহিত্য লিখেছেন তিনি বড়ু চণ্ডীদাস নন। মোদ্দা কথা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের জীবনের তিনটি প্রামাণ্য গ্রন্থ — ভাগবত (বাল্যলীলা), মহাভারত (যৌবনকালের ইতিহাস), হরিবংশ (বৃদ্ধকালের ইতিহাস) এই তিন গ্রন্থের কোথাও রাধা নেই। রাধা একটি দার্শনিক তত্ত্ব। তাত্ত্বিক দিক থেকে তার গুরুত্ব অসাধারণ কিন্তু রাধার মানবীয় ইতিহাস যা আছে তা সাহিত্যে, রক্ত মাংসের মানুষে নন। সাহিত্যের দৃষ্টিতে সেটির গুরুত্বও কিন্তু কম নয় যদিও সে আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।
এখন প্রশ্ন হলো তাহলে রাধা কি একেবারেই গুরুত্বহীন কিছু? মোটেই নয়।

কেননা ‘রাধা’ তত্ত্বের যে প্রয়োজনীয়তা তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর সম্পর্কে, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে পারস্পারিক মিলন সম্পর্কে রাধা তত্ত্ব খুবই উচ্চ মার্গীয় দর্শনকে উপস্থাপন করে। আর একারণে বৈষ্ণব পদাবলির কবিতা আমাদের গভীর মগ্নতায় আচ্ছন্ন করে, ঈশ্বর প্রেমের এক স্বর্গীয় বার্তা নিয়ে আসে।

রূপলাগি আখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পীরিতি লাগি স্খির নাহি বান্দে।।
(জ্ঞানদাস) তত্ত্ব, দর্শন ও সাহিত্য থেকে আমরা সাধনার রসটুকু নেবো আর শ্রীকৃষ্ণের জীবনের সঠিক ইতিহাস ঘেটে তাঁর সমৃদ্ধ জীবনের শিক্ষাকে গ্রহণ করবো। দুই মিলে আমাদের কৃষ্ণ অনুসরণ সার্থক হবে। ফলে রাধা প্রেমী বাঁশীকৃষ্ণকে তো আমরা বহু চিনেছি পাশাপাশি চিনতে হবে

সুদর্শনধারী কৃষ্ণকে, অন্যায়, অবিচার ও অসুর ধ্বংসকারী কৃষ্ণকে ধর্ম সমন্বয়ক কৃষ্ণকে, চিনতে হবে রাজনীতিবিদ কৃষ্ণকে, ধারণ করতে হবে পরমপুরুষ যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সত্য জীবনাদর্শনকে।

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস ও মতামত কলামে লিখতে পারেন আপনিও – Peoplesnews24.com@gmail.com ইমেইল করুন  

সর্বশেষ

জনপ্রিয় সংবাদ