ঢাকা, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

” হাজার বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কার্তিকপুরের মৃৎশিল্পীরা”

প্রকাশিত: বুধবার, জানুয়ারি ২২, ২০২০ ৯:০১ অপরাহ্ণ  

| মো. ওমর ফারুক, শরীয়তপুর

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের প্রত্তন্ত অ লসহ শহুরে মানুষের বাড়ীতে নিত্য দিনের সাংসারিক কাজে ব্যবহার হতো মাটির তৈরি পণ্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহার। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের বিকল্প হিসেবে এযুগের মানুষ ব্যবহার করছে বিভিন্ন আধুনিক পণ্য তথা প্লাষ্টিক ও মেলামাইন। কেননা এযুগের মানুষ আধুনিকতায় ঝুকে পরছে।কিন্তু এই মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কার্তিকপুরের মৃৎশিল্পীরা।

শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম কার্তিকপুর। এ গ্রামের পাল বংশের লোকদের আদি পেশা মাটি দিয়ে কলস, টালি, মটকা, হাঁড়ি, পাতিল, বদনাসহ নানা তৈজসপত্র তৈরি করা। কুমার বা পালরা বংশপরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। মো. ওমর ফারুক দেখে এসেছেন আধূনিকতার ছোঁয়ায় হারাতে বসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প। মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যাবহারের চাইতে আধুনিক জিনিসপত্রের ব্যাবহার সহজলভ্য হওয়ায় মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহার ভূলে মানুষ প্লাষ্টিক ও মেলামাইনের পণ্য ব্যাবহার করছেন।

তবে আধুনিক যুগে থেকেও কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার ভুলে যাননি। কেননা মৃৎ শিল্পিরা তাদের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মাটির কাজ করে এখনো টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্ত মাটির তৈরি পণ্যের ক্রেতা এবং সঠিক মূল্যায়ন না থাকায় ধীরে ধীরে মৃৎ শিপ্লিরা এ পেশা থেকে অন্য পেশায় ঝুকতে শুরু করেছে। হারাতে শুরু করেছে প্রাচীন সভ্যতা। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মধ্যে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করতে দেখা যায়। তবে রশুনিয়া ইউনিয়নের চোরমর্দ্দন পালপাড়া ও বাসাইল ইউনিয়নের দিঘীরপাড় কুমারবাড়িতে সবচেয়ে বেশি মৃৎশিল্পীদের দেখা যায় ।
সেখানে অন্যান্য পরিবারের মধ্যে রঙ্গদীপের পরিবার একটি। মা-বাবা আর পাঁচ ভাই, এক বোনসহ আট সদস্যের পরিবার ছিল রঙ্গদীপ পালের। ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি।

পরিবারের সব সদস্য মিলে তখন মাটির টালি তৈরির কাজ শুরু করেন। তবে টালির চাহিদাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। কোনোমতে খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটছিল তাঁদের। এটা আশির দশকের কথা। এর মধ্যে দিদি অনুরাধা পালের বিয়ে হয়ে যায়। তখনো অভাব লেগেই ছিল। আশির দশকের শেষ দিকে দিদি অনুরাধা পালের ভাশুর মরণ চাঁদ আসেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি ঢাকায় চারুকলার শিক্ষক। তাঁর পরামর্শে মাটির টেরাকোটা, টাইলস, মোমদানি, ফুলদানি, ফুলের টব, নাইট ক্যান্ডেল, কয়েন বক্স, ক্যাকটাস টব, ওয়াল প্লাস্টার, ওয়াল টব, কলমদানি, ভিজিটিং কার্ড বক্স, মা মেরির মূর্তি, ক্রিসমাস হ্যাংগিং রিংসহ ৩০০ ধরনের শোপিস তৈরি করে রঙ্গদীপ পালের পরিবার।

পণ্যগুলো প্রথমে দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে পরে দেশের গণ্ডি ছাড়ায়। রঙ্গদীপ পালের দেখাদেখি আরো দুটি মৃিশল্পের কারখানা গড়ে উঠেছে কার্তিকপুরে। একটি মথুরা মোহন পালের পুত্র জওহরলাল পালের, অন্যটি কালাচান পালের পুত্র উত্তম পালের। রঙ্গদীপ পালের ভাই সমীর পাল, সন্দ্বীপ পাল আর গোবিন্দ পালও নিয়মিত কাজ করছেন। কার্তিকপুরের শিল্পসম্ভার এখন ইউরোপ, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ায়ও আদর পাচ্ছে।

নিজের বানানো শিল্পকর্ম হাতে রঙ্গদীপ পাল যেভাবে তৈরি হয়।প্রথমে দো-আঁশ মাটি সংগ্রহ করা হয়। এই মাটি পানির সঙ্গে মিশিয়ে তরল করা হয়। পরে জার্মানি থেকে আমদানি করা বিশেষ ধরনের জালি বা নেট দিয়ে ছাঁকা হয়। এরপর ২০ দিন পর্যন্ত বিশেষ পাত্রে ঝুলিয়ে রেখে পানি ঝড়ানো হয়। পানি ঝড়া শেষ হলে তৈরি হয় মণ্ড। এই মণ্ড রোদে শুকিয়ে তা আবার পানি মিশিয়ে নরম করে নকশা অনুযায়ী মূল পণ্য তৈরি করা হয়। তৈরি কাঁচা পণ্য সরাসরি রোদে বা আগুনে শুকানো যায় না। এগুলোকে মাচা করে ঘরের ভেতরে ১০-১২ দিন পর্যন্ত রেখে শুকাতে হয়।

শুকানো পণ্যের গায়ে স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা রং মেখে বিক্রির উপযোগী করে তোলা হয়। মৃিশল্পী সন্দ্বীপ কুমার পাল জানান, বংশপরম্পরায় তাঁরা মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য নির্মাণ ও বিক্রি করেন। ১৯৭৬ সালে প্রথম তাঁরা মাটির তৈরি নিত্যনতুন পণ্য তৈরি করেন। বিক্রি শুরু করেন ঢাকা ও চট্টগ্রামে। পাশাপাশি মেলাগুলোতেও অংশ নিতেন। এর পর থেকে তাঁদের নির্মিত পণ্যের মান দেখে ক্রমেই তাঁদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় কয়েকটি সংস্থা। তাঁদের তৈরি পণ্যগুলো ওই সব সংস্থা দেশের বড় বড় প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করে এবং বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

রঙ্গদীপ পাল বলেন, মৃিশল্প বানিয়ে মাসে ৪০-৪৫ হাজার টাকা আয় করি। ৩৮ বছর যাবত্ এ কাজ করে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সুনাম অর্জন করেছি। কয়েকবার ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সনদও পেয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, এ ব্যবসা করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এ জন্য ঢাকায় অফিস বা শোরুম থাকতে হয়। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারলে আরো বেশি পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। আর এ জন্য সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস ও মতামত কলামে লিখতে পারেন আপনিও – Peoplesnews24.com@gmail.com ইমেইল করুন  

সর্বশেষ

জনপ্রিয় সংবাদ