
খুলনা জেলায় চলতি বছরে ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হলেও ১০টি এখনো অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রূপসা উপজেলায়। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ দুটি ‘টার্গেট কিলিং’-এর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার ‘ডাবল ডোজ’ অভিযান শুরু করেছে জেলা পুলিশ।
রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এসব এলাকায় ২৪ ঘণ্টা অভিযান, চেকপোস্ট স্থাপন ও ব্লক রেইড চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। খুলনা জেলার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চাই।
অপরাধীদের উদ্দেশে তার কড়া বার্তা মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে এলাকায় কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে খুলনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে হত্যাকাণ্ডের একটি অংশ ঘটছে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও হত্যাকাণ্ড বাড়াচ্ছে। এ কারণে বিশেষ অভিযানে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলি করে ‘টার্গেট কিলিং’ করা হয়েছে ৯টি। এ ছাড়া মাদককে কেন্দ্র করে ৩টি, সামাজিক দ্বন্দ্ব বা মারামারিতে ১৩টি, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ে ২টি, অজ্ঞাত কারণে ২টি এবং পারিবারিক বা পরকীয়াজনিত কারণে ৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পাশাপাশি শ্বাসরোধে ২টি নবজাতক হত্যার ঘটনাও রয়েছে। পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনেও মূলত মাদককেন্দ্রিক বিরোধ কাজ করেছে।
রূপসাকে অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে ভৌগোলিক ও জনবসতিগত কারণও দেখছে পুলিশ। খুলনা শহরের কাছাকাছি হলেও রূপসা নদী দিয়ে শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চল। ফলে অপরাধ সংঘটন করে নদীপথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় অপরাধীরা। পাশাপাশি ঘনবসতি, অসংখ্য সরু গলি ও শাখা-প্রশাখা সড়ক অপরাধীদের আত্মগোপন এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তনে সহায়তা করছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে এই চার থানায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নড়াইল ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ২৫০ পিস ইয়াবা ও এক কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের একটি বড় অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের চলাচলের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে একাধিক ‘ওয়াচারকেও’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান সাফল্য না থাকায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুপার নিজেই জানিয়েছেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অভিযান চললেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার ভাষ্য, আগের অভিযান যথেষ্ট তীব্র ছিল না, তবে এবার কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাছে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও রূপসায় এক ব্যক্তি কীভাবে হত্যার শিকার হলেন?
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, নিরাপত্তা চাওয়ার তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকেই সন্ত্রাসীদের কাছে ফাঁস হয়েছিল। পুলিশ সুপার বিষয়টি অস্বীকার না করে বলেন, ওই ঘটনায় সংবেদনশীলতা (সেনসিটিভিটি) যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
শুধু অভিযান নয়, ভাড়াটিয়া শনাক্তকরণ ও সিসিটিভি ব্যবস্থার ঘাটতিকেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে পাশের বাড়িতে কে থাকছে, সেই তথ্যও অনেক সময় পুলিশের কাছে থাকে না। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
এই বিশেষ অভিযান কতদিন কার্যকর থাকবে, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে চেকপোস্ট কয়েক দিন জোরালো থাকার পর ধীরে ধীরে তা ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এবার তদারকি ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টাই বজায় রাখা হবে। মাদক স্পট, সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য আস্তানা এবং চাঁদাবাজদের আস্তানায় অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, একক প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার কেএমপি, জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। আসন্ন দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাই এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক কোনো প্রভাবে বা অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট জানান তিনি।























