
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আসন্ন দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এসব নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে শুরু হওয়া সভা চলে তিন ঘণ্টার বেশি সময়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সভা শেষ হয়। এতে বিএনপির ১৯৪ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্তত ২৫ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন বলে জানা গেছে।
একাধিক সংসদ সদস্য জানান, বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে কোনো নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রী কেউ কোনো অপকর্মে জড়ালে বিন্দু মাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকার গঠনের পর ৮ মাসে কী কী কাজ হয়েছে, কোন কাজের অগ্রগতি কতটুকু এবং কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে-এসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকার সমস্যার বিষয়েও সংসদ সদস্যদের কথা শুনেছেন তিনি।
কয়েকজন সংসদ সদস্য জানান, বৈঠকে কেউ কেউ সমালোচনা করে বলেন যে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জামিনে মুক্ত হচ্ছে। এর পেছনে কারণ কী সেসব পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাছাড়া বিএনপির কোনো অ্যাডভোকেট যাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে ওকালতি করতে না পারে সে বিষয়েও কঠোর হওয়ার কথা বলেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তব্য দেন কয়েকজন এমপি। তারা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। অতীতে হয়তো তারা অন্য একটি দলকে ভোট দিতেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
সূত্র জানায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে জনপ্রিয় এবং যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় নির্বাচনে এলাকার জনপ্রিয় লোকদের সমর্থন দিতে হবে। কেউ যেন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কাউকে প্রার্থী না করে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংসদ সদস্যরা যাতে দলকে ভুলে না যান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দলকে শক্তিশালী করতে হবে।
খুলনার একজন সংসদ সদস্য বলেন, সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। জনগণের সঙ্গে থাকেন, জনগণের সঙ্গে কাজ করেন, জনগণের জন্য কাজ করেন। যাতে জনগণ সন্তুষ্ট থাকে।
সংরক্ষিত নারী আসনের একাধিক সংসদ সদস্য জানান, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা, নিজেদের মধ্যে একতা বজায় রাখা এবং সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে কয়েকজন সংসদ সদস্য শেখ হাসিনার বিষয় নিয়ে কথা বললেও দেশে ফিরলে গণতান্ত্রিক উপায় ও আইনগত যা করার তা করা হবে। বরিশালের একজন সংসদ সদস্য জানান, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের এলাকায় কেউ যাতে চাঁদাবাজি করতে না পারে সেইদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে যদি দলীয় কেউ জড়িত থাকে; তাহলে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, কয়েকজন সংসদ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার ডিসি ও ইউএনওদের ওপর। তাদের অভিযোগ-এমপিদের কথা শুনছে না ডিসি ও ইউএনওরা। বিশেষ করে সারের ডিলারশিপ নিয়ে অনেক এলাকায় এমপিদের কথা তারা শোনেনি। এমনকি এমপি-মন্ত্রীদের জন্য নির্বাচনী এলাকায় যে বরাদ্দ যায় সেগুলোও প্রশাসন অবহিত করেন না। তারা নিজেদের মতো করে বন্টন করে দেন। তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কোনো কথা বলেননি।
বৈঠকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদারকি বাড়াতে এমপিদের কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তখন কয়েকজন সংসদ সদস্য প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। বৈঠক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা শুরুটা ভালো করে করতে চাই। এজন্য ছোট শিশুদের স্কুলে আনার জন্য দলের প্রতিটি কমিটিকে কাজে লাগাতে হবে।
সভায় বিএনপির শীর্ষ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
এদিকে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এক সভা শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, সভায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি, দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা এবং সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। অন্যায় করে বিএনপির নাম ব্যবহার করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সঠিক প্রার্থী বাছাই করতে হবে। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা যাতে নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। আগে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতো। বিএনপি চায়, নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। এ বিষয়ে দল পরে সিদ্ধান্ত নেবে।
বৈঠকে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারেন এবং তাঁদের জীবনযাপনে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে। প্রয়োজন হলে তাদের সরিয়ে এনে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।























