• আজ

গ্রেপ্তার এড়াতে মৃত যমজ ভাইয়ের ছদ্মবেশ, প্রেমিকার তথ্যে ২৪ বছর পর ধরা

গ্রেপ্তার এড়াতে মৃত যমজ ভাইয়ের ছদ্মবেশ, প্রেমিকার তথ্যে ২৪ বছর পর ধরা

মৃত যমজ ভাইয়ের পরিচয় ধারণ করে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আসা চীনের এক পলাতক ডাকাত অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। মৃত ভাইয়ের সাবেক প্রেমিকার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ ২৪ বছর পর ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে দেশটির পুলিশ। অবিশ্বাস্য এই পরিচায়ক জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০০২ সালে পূর্ব চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউহুয়ানে। সেখানে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নগদ অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের ঘটনায় সাতজন জড়িত ছিল। স্থানীয় পুলিশ দ্রুতই ছয় সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও চেন নামের সপ্তম ব্যক্তি পালিয়ে যান। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও তার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় একপর্যায়ে মামলার অগ্রগতি থমকে যায়।

এর পাঁচ বছর পর, ২০০৭ সালে মধ্য চীনের আনহুই প্রদেশ থেকে ইউহুয়ান পুলিশ একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পায়। তাতে জানানো হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় চেনের নাগরিক নিবন্ধন (হাউসহোল্ড রেজিস্ট্রেশন) বাতিল করা হয়েছে। একপর্যায়ে সন্দেহভাজন মৃত ভেবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির তদন্ত স্থগিত করে।

তবে দীর্ঘ ১৯ বছর পর নিয়মিত পর্যালোচনা চালাতে গিয়ে আনহুই থেকে একটি অস্বাভাবিক সূত্র খুঁজে পায় ইউহুয়ান পুলিশ। সেখানে ইঙ্গিত মেলে, স্থানীয় এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার মৃত যমজ ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। এ সূত্র ধরে অপরাধ তদন্তকারী কর্মকর্তা লং ইউওয়েন ২০০২ সালের ডাকাতির মূল নথি পর্যালোচনা করে আসামির পরিচয়, জন্মস্থান ও পারিবারিক সম্পর্কের মিল শনাক্ত করেন।

এরপরই ইউহুয়ান পুলিশের একটি বিশেষ তদন্ত দল ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে আনহুই প্রদেশে যায়। তবে সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের অসহযোগিতার মুখে পড়েন তারা। চেনের মা, বোন ও প্রতিবেশীরা দাবি করেন যে দুর্ঘটনায় ছোট চেনই মারা গেছেন। বাস্তবে যিনি বেঁচে ছিলেন, তিনিই ছিলেন পলাতক ছোট চেন; যিনি মৃত বড় যমজ ভাইয়ের পরিচয় নিজের বলে চালিয়ে আসছিলেন। এমনকি স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়, ট্রাফিক পুলিশ ও শেষকৃত্য ভবনের পুরোনো নথিতেও চেনের মৃত্যুর কথা লিপিবদ্ধ ছিল এবং দুর্ঘটনার মূল নথি না পাওয়ায় সত্য প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ উপায় হিসেবে পুরোনো পরিচয়পত্রের ছবির শরণাপন্ন হন তদন্তকারীরা। যমজ হলেও তাদের চেহারায় কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৭ সালে চেন মারা যাওয়ার মাত্র নয় দিন পর তার ‘বড় ভাই’ নিজের নাম পরিবর্তনের আবেদন করেন। ওই সময় জমা দেওয়া নতুন পরিচয়পত্রের ছবির মুখাবয়ব ও অভিব্যক্তির সঙ্গে আগের ছবির সুস্পষ্ট অমিল ধরা পড়ে।

পরিবারের সদস্যরা সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ বড় ভাইয়ের সাবেক প্রেমিকা দেং-এর খোঁজ পায়। দুর্ঘটনার আগে ওই বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেং-এর বিয়ের কথা চলছিল, কিন্তু আকস্মিক ওই ঘটনার পরই তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পুলিশ আইনগত বিষয় বুঝিয়ে বলার পর দেং নিশ্চিত করেন যে ১৯ বছর আগের ওই সড়ক দুর্ঘটনায় মূলত চেনের বড় ভাই-ই মারা গিয়েছিলেন, আর বেঁচে থাকা ব্যক্তিটিই ছিলেন সেই পলাতক আসামী চেন।

এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গত জুন মাসে অপরাধের দীর্ঘ ২৪ বছর পর চেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এতগুলো বছর ধরে নতুন নামে পুরোপুরি নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়ে আসছিলেন তিনি। চীনের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ডাকাতির দায়ে এখন তার তিন থেকে দশ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘এই ঘটনায় সাবেক প্রেমিকার সঙ্গেই সবচেয়ে খারাপ অবিচার হয়েছে।’ আরেকজন প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘পলাতক আসামিকে আশ্রয় ও তথ্য গোপনের অপরাধে চেনের মা এবং বোনেরও কি বিচার হওয়া উচিত নয়?’