
মুখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, আর নিজেদের পরিবারের বেলায় সবার আগে বিদেশে বন্দোবস্ত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী।
রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।
পোস্টে নাসিরুদ্দীন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির একটা চমৎকার ভাগবাঁটোয়ারা আছে। দেশ বাঁচাবে কর্মী, পরিবারের ভবিষ্যৎ বাঁচাবেন নেতা। কর্মীর সন্তান মিছিলে যাবে, নেতার সন্তান বিদেশে ক্যারিয়ার গড়বে। বক্তৃতায় অবশ্য সবাই একই পরিবারের। কী সুন্দর পরিবার! বিপদের ভাগটা নিচে নামে, সুবিধার ভাগটা ওপরে ওঠে।
তিনি লেখেন, এখন চিফ হুইপের তিন ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, সেখানকার নাগরিক, চাকরি করেন। তাদের ভবিষ্যতের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু যে কর্মী নিজের চাকরি, পড়াশোনা, সংসার ফেলে দলের পেছনে ঘোরেন, তার সন্তানের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কার? নেতার সন্তানের ক্যারিয়ার আছে, কর্মীর সন্তানের জন্য শুধু স্লোগান?
সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ঢাকা মেডিকেলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নিজে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নেন। আর সাধারণ মানুষ দেশের হাসপাতালেই চিকিৎসা খোঁজেন। সভাপতির জন্য বিদেশের হাসপাতাল, জনগণের জন্য দেশের ব্যবস্থার উন্নতির আশ্বাস। আমগো অসুখটাও বুঝি উন্নয়ন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে!
বিদেশে পড়া কিংবা চিকিৎসা নেওয়া অপরাধ নয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, যাঁরা দেশের স্কুল, হাসপাতাল আর প্রতিষ্ঠান চালানোর দায়িত্ব নেন, তাদের পরিবারের জন্য বিকল্প আছে; জনগণের জন্য কী আছে? সরকারি স্কুলে শিক্ষক না থাকলে কার সন্তানের পড়া বন্ধ হয়? হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা না মিললে কে বাড়ি ফিরে অসহায় বসে থাকে? রাজনীতির ঝুঁকির হিসাবেও এই প্রশ্ন চাই। কর্মী আহত হলে তার চিকিৎসা কে করবে? মামলা হলে পরিবার কে চালাবে? নেতৃত্ব বিদেশে থেকেও দল চালাতে পারে, কিন্তু মাঠের কর্মী নিজের বিপদটা বিদেশে পাঠাতে পারেন না। তাঁর সংসার, মামলা, চিকিৎসার বিল সব দেশেই থাকে। দলের বিজয়ের ছবিতে তাকে লাগে, সিদ্ধান্তের টেবিলে কেন লাগে না?
নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে বিসিবির পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন হয়েছে, এবার যোগ্যতা আর কাজের হিসাবও সামনে আসুক। বাবার পদ সন্তানের যোগ্যতার সনদ নয়। মজার ব্যাপার, সাধারণ তরুণকে অভিজ্ঞতা দেখাতে হয়; প্রভাবশালীর সন্তানকে নিয়েই বরং প্রশ্ন ওঠে, পারিবারিক পরিচয় কতটা সুবিধা দিল?
তিনি আরও লেখেন, খালেদা জিয়াকে আমরা সম্মান করার বড় কারণ তার দেশে থেকে লড়াই করার ইতিহাস। তিনি মাঠে নেমেছেন, নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন, তার গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব আর দীর্ঘ অসুস্থতার কঠিন সময়ও তিনি এই দেশেই কাটিয়েছেন। জীবনের শেষ বছরে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েও দেশে ফিরে এসেছিলেন; জীবনের শেষ নিশ্বাসও ছেড়েছেন বাংলাদেশের মাটিতে। দলের দুঃসময়ের কষ্ট কেবল মাঠের কর্মীদের ভাগে পড়েনি, তাকেও সেই কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
মনোনয়নে স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার মানে এই পারিবারিক বন্দোবস্তে হাত দেওয়া।। দলের নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা হলে উত্তরাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে। মনোনয়নে স্বচ্ছতা এলে পারিবারিক নিশ্চয়তা কমে। সম্পদের হিসাব চাইলে ক্ষমতার সুবিধা দৃশ্যমান হয়। তাই সংস্কারের পরীক্ষা বক্তৃতায় হবে না, নিজের পরিবারের সুবিধা কমাতেও রাজি কি না, সেখানে হবে।
এনসিপির এই নেতা লেখেন, এই সরকারকেও সেই পরীক্ষাই দিতে হবে। জনগণের কাছে ত্যাগ চাইবেন, অথচ ক্ষমতা ও সুযোগ বণ্টনের সময় নিজেদের পরিবার আর ঘনিষ্ঠদের আগে রাখবেন, এই পুরোনো ব্যবস্থার অবসান কোথায়? সাধারণ কর্মী সারাজীবন মিছিল করবেন, আর নেতৃত্বের দরজায় গিয়ে শুনবেন, ভেতরে পারিবারিক বৈঠক চলছে! রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানও কি সেই বৈঠকের সিদ্ধান্তে চলবে?
নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, দেশের স্কুল খারাপ হলে সাধারণ মানুষের সন্তানের বছর নষ্ট হয়। হাসপাতাল খারাপ হলে সাধারণ পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়। রাজনৈতিক সংঘাত হলে মাঠের কর্মীর সংসারে বিপদ নামে। যাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা আছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার পুরো মূল্য কেন তাঁদেরই দিতে হবে, যাঁদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই?
সবশেষে তিনি লেখেন, জনগণ এই দেশে ফুলটাইম থাকে। তাদের অসুখ, বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা কোনো কিছুই পার্টটাইম নয়। তাই দেশের দায়িত্ব নিয়ে সুবিধামতো উপস্থিত থাকার রাজনীতি চলতে পারে না। মুখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, আর নিজেদের পরিবারের বেলায় সবার আগে বিদেশে বন্দোবস্ত!























