=== console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block.
  • আজ ২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুলিয়ারচরে অতিদরিদ্রের কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগেসহ নানা অনিয়ম

| নিউজ রুম এডিটর ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ | ১৩/০৪/২০২২ সারাদেশ

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, মোঃ মাইন উদ্দিন : কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ও সালুয়া ইউনিয়নে অতিদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন (ইজিপিপি) প্রকল্পে বরাদ্দ অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগ না দেওয়া, টাকা আত্মসাৎ সহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

ফরিদপুর ও সালুয়া ইউপি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর ইউপিতে ইজিপিপির ৪টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ আসে ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং সালুয়া ইউপিতে ইজিপিপির ৬টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ আসে ৪৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এ দুটি ইউনিয়নে প্রকল্পের আওতায় ৪২৭ জন অতিদরিদ্র শ্রমিকের সুবিধা পাওয়ার কথা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যগন।
প্রকল্পের কার্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি যাঁর কাজের সামর্থ্য আছে এবং ভূমিহীন। বাড়ি ছাড়া ৫ শতাংশের কম পরিমাণ জমি আছে। যে ব্যক্তির মাসিক আয় ৪ হাজার টাকার কম অথবা যাঁর মাছ চাষের জন্য পুকুর বা কোনো প্রাণিসম্পদ নেই। দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, গ্যাস মিস্ত্রি এবং কারখানার শ্রমিক অথবা যাঁর অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই। এমন অদক্ষ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি পরিবার থেকে মাত্র একজন এই কাজের জন্য নির্বাচিত হবেন।

কার্যাদেশ মোতাবেক ৩৫ সেন্টিমিটার মাটি কাটার চুক্তিতে প্রতিদিন মাথাপিছু ৪০০ টাকা মজুরির ভিত্তিতে অতিদরিদ্র শ্রমিকেরা ৪০ দিন মাটি কাটার কাজ করার সুবিধা পাবেন এ প্রকল্পের আওতায়। বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শ্রমিকদের মাটি কাটার কথা। কিন্তু উপজেলার ফরিদপুর ও সালুয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের তালিকায় সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা করে একাধিক দফাদার, চৌকিদার, প্রভাবশালী, ব্যবসায়ীসহ ইউপি সদস্যের ছেলে ও তাদের নিকটাত্মীয়দের নাম রয়েছে। তালিকাভূক্ত অধিকাংশ শ্রমিক কাজে অংশগ্রহণ না করলেও তাদের নামে ৪০ দিনের কাজ দেখিয়ে নির্ধারিত টাকা উত্তোলন করে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও লেভার সর্দারসহ প্রভাবশালীদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজনের নাম ব্যবহার করে অন্যজনের মোবাইল নাম্বারে একাউন্ট খুলে টাকা উত্তোলন করেছে।

অভিযোগ রয়েছে শ্রমিকদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে তাদের নামে সিমকার্ড তুলে ও একাউন্ট খোলে অনেকের হাতে সিমকার্ড ও পাসওয়ার্ড না দিয়ে কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য, লেভার সর্দার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অফিসের প্রতিনিধি যৌথ যোগসাজশে টাকা তুলে শ্রমিকদের ন্যায্য টাকা না দিয়ে তারা আত্মসাৎ করেছে।
সরেজমিনে গিয়ে এমনও প্রমাণ পাওয়া গেছে, সালুয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পের তালিকায় থাকা লেভার সর্দার মোঃ খাইরুল ইসলাম স্থানীয় কোটিপতি ঠুলি মৌলোভীর ছেলে। তার বিরুদ্ধে কাজ না করে টাকা উত্তোলনসহ নানান অভিযোগ রয়েছে। সে শ্রমিকদের সিমকার্ড নিজ হেফাজতে রেখে নিজে টাকা তুলে কিছু টাকা কর্তন করে রেখে দিয়েছে। বাকী টাকা শ্রমিকদের দিয়েছে।

এ ব্যাপারে লেভার সর্দার মোঃ খাইরুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজে টাকা উত্তোলন করে শ্রমিকদের মাঝে বিতরণের কথা স্বীকার করলেও শ্রমিকদের মাঝে টাকা কম দেওয়ার কথা অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, আমি নিয়মিত কাজে যাইনি তাই আমার কাছে কোন হাজিরা খাতা কিংবা লেভারদের তালিকা নেই। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যানের লোক তাই কাজে না গিয়েও পুরো ৪০ দিনের টাকাই উত্তোলন করতে পেরেছি।

৩নং ওয়ার্ডের প্রকল্প সভাপতি সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য মোঃ আলী আকবর বলেন, আমার প্রকল্পে মোট ৬৪ জন শ্রমিকের মধ্যে আমি ১৪ জনের নাম দিয়েছি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৫ জনের নাম দিয়েছে। ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ৩ জনের নাম দিয়েছে। তাদের সীমকার্ড আমি শ্রমিকদের নিকট বুঝিয়ে দিয়েছি। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেদেওয়া ৪২ জন শ্রমিকের সীম আমার হাতে ছিলোনা। তাই ওসব সীমকার্ড না পেয়ে শ্রমিকরা আমার নিকট অভিযোগ করার পর আমি এ বিষয়ে চেয়ারম্যান সাহেবকে অবগত করেছি।

অপরদিকে সালুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের দড়িগাঁও দক্ষিণ পাড়া গ্রামের মোঃ আলম মিয়ার স্ত্রী মোছাঃ রেহেনা বেগম (৪০) বলেন, ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছাঃ জামেনার ছেলে মোঃ এমাদ মিয়া ৫ বছরের জন্য ৪০ দিনের মাটি কাটার নাম দেওয়ার কথা বলে আমার নিকট ১০ হাজার টাকা দাবী করে। আমি বহুকষ্ঠ করে তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। তাহার চাহিদা অনুযায়ী আরো ৫ হাজার টাকা দিতে না পারায় ১৫ দিন কাজ করানোর পর এমাদ মিয়া বলে চেয়ারম্যান সাহেব আপনার নাম কেটে দিয়েছে। কাজের ফাঁকে সে আমাকে কামালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে ছবি তুলেছে, ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে ডাচ্ বাংলা একাউন্ট খুলে সীমকার্ড তার জিম্মায় রেখে দিয়েছে। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ কামরুল ইসলাম আমাকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে বাকী টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে।

একই গ্রামের টনি মিয়ার স্ত্রী ডলি বেগম (২২) বলেন, এমাদ মিয়া ৪০ দিনের মাটিকাটার তালিকায় আমার নাম দিয়েছে বলে আমাকে কাজে লাগানোর ১৫ দিন পর বলে চেয়ারম্যান সাহেব আপনার নাম কেটে দিয়েছে। কাজের ফাঁকে সে আমাকে কামালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে ছবি তুলেছে, ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে ডাচ্ বাংলা একাউন্ট খুলে সীমকার্ড তার জিম্মায় রেখে দিয়েছে। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ কামরুজ্জামান আমাকে ৩৫০০ টাকা দিয়ে বাকী টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে।

এছাড়া এই গ্রামেরই শহিদ মিয়ার স্ত্রী পারভীন বেগম (৩৫) বলেন, এমাদ মিয়া ৪০ দিনের মাটিকাটার তালিকায় আমার নাম দিয়ে কাজের ফাঁকে সে আমাকে কামালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে ছবি তুলেছে, ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে ডাচ্ বাংলা একাউন্ট খুলে সীমকার্ড তার হাতে রেখে দিয়েছে। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ কামরুজ্জামান আমাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছে। বাকী টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে।

এ ব্যাপারে ২নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, ৯ দিন কাজ করানোর পর দেখা যায় প্রকল্পের নামের তালিকায় রেহেনা ও ডলিসহ আরেক জনের নাম নেই। তার পরও তাদেরকে কিছু টাকা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাকে কত টাকা দেওয়া হয়ে তা ঠিক করে বলতে পারেননি সে।

অভিযোগ রয়েছে ২নং ওয়ার্ডের কাজের তালিকায় ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছাঃ জামেনার ছেলে মোঃ সাইফুল ইসলাম (৩৫) এর নাম থাকলেও সে কোন কাজ না করেই ৪০ দিনের টাকা উত্তোলন করেছে এবং ওই প্রজেক্টের লেভার সর্দার আঃ সাত্তার ও মুক্তার উদ্দিন মুক্তু সচ্ছল থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম দিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

এছাড়াও মোছাঃ জামেনার কাজকর্ম করতে বিভিন্ন সময় ইউনিয়ন পরিষদে কিংবা উপজেলায় দৌড়াদৌড়ি করছে এমন অভিযোগও রয়েছে ছেলে মোঃ এমাদের বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে এমাদ মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি মোছাঃ রেহেনা বেগমের নিকট থেকে টাকা নেওয়া কিংবা টাকা দাবী করার কথা অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে একই দক্ষিণ সালুয়া ৯নং ওয়ার্ডের মোঃ শুক্কুর আলী বলেন, আমি ৪০ দিন কাজ করার পর মেম্বার মোঃ সোহেল মিয়া আমার মোবাইল নিয়ে ডুমরাকান্দা বাজারের একটি বিকাশের দোকান থেকে ১২ হাজার টাকা তুলে আমার হাতে ৫ হাজার টাকা দিতে চাহিলে আমি টাকা নেইনি। পরে বাড়ি এসে স্থানীয় কালনার পাড় মোড়ে কবিরের চায়ের দোকানে আমার কাজের ১২ হাজার টাকা চাহিলে সে আমাকে টাকা না দিয়ে মারধোর করে। বিষয়টি অনেকেই দেখেছে।

এ ব্যাপারে চা দোকানদার কবির মিয়া ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, শুক্কুর আলী একজন প্রতিবন্ধী। সোহেল মেম্বার শুক্কুর আলীকে শাটের কলারে ধরে টানা হেছরা করতে দেখেছি।

৯নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ সোহেল মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুক্কুর আলীকে মারধোরের কথা অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, তার টাকা তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, ‘শুনেছি এলাকার অতিদরিদ্র এবং মৌসুমি বেকার শ্রমিক পরিবারের জন্য সরকার ইজিপিপি প্রকল্প বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারগন আমাদের মতো অতিদরিদ্র শ্রমিকদের প্রকল্পের কাজে নিয়োগ দেননি।’ অধিকাংশ সচ্ছল ব্যক্তি, দফাদার, চৌকিদার, ব্যবসায়ী এবং চেয়ারম্যান মেম্বারদের হিতাকাঙ্ক্ষীরা এ কাজের তালিকাভূক্ত হয়েছে। সঠিক ভাবে তদন্ত করা হলে আসল সত্যতা বেরিয়ে আসবে। তারা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান।

এসব বিষয়ে সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কাইয়ুম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কাজের তালিকা তৈয়ারী করার সময় আমি গুরুতর অসুস্থ ছিলাম। প্রজেক্টের সভাপতিরা কিভাবে তালিকা করেছে কিংবা কাজ করিয়েছে তা আমি অবগত নই। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আমি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
অপর দিকে ফরিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান এস.এম. আজিজ উল্ল্যাহ’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো ইনশাআল্লাহ।

এ ব্যাপারে কুলিয়ারচর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ ওমর ফারুকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এসব বিষয়ে আমি অবগত নই। কেউ যদি আমাদের নিকট লিখিত অভিযোগ করে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।