• আজ

কাবাঘর বাঁচাতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসেছিল সবুজ পাখি

কাবাঘর বাঁচাতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসেছিল সবুজ পাখি

তখন ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। ইয়েমেনের গভর্নর আবরাহা একটি সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মক্কার কাবাঘর ধ্বংস করতে রওনা হলো। শক্তিশালী সে বাহিনীর বাহন ছিল হাতি। এ খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল মক্কাবাসী ও কাবাপ্রেমীদের মধ্যে। মর্মাহত তারা। কাবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ম্রিয়মানও। তাদেরও শক্তি নেই আবরাহাকে প্রতিহত করবে। পাঁজড় শক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে তার বাহিনীর সামনে। তবুও কোনো কোনো আরব গোত্র মোকাবিলায় এলেন। কুলিয়ে উঠতে পারলেন না কেউও। জল্লাদের তরবারিতে সবাই কাবাপ্রেমে উৎসর্গ করলেন প্রাণ।

দুর্দান্ত ও অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগুতে থাকল আবরাহার বাহিনী। কেউ তাদের পথরোধ করতে পারল না। মক্কা আসার পথে-প্রান্তরে চারণকৃত জন্তু-জানোয়ার ভোগ করতে থাকল তারা। এরই ধারাবাহিকতায় কুরাইশ গোত্রের উটের চারণভূমিতে হামলা চালিয়ে সব উট বন্দি করে নিয়ে গেল। মুহাম্মাদ (সা.)-এর দাদা কুরাইশ নেতা ও কাবাঘরের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মুত্তালিবেরও দুইশ উট ছিল এতে। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মূল: মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভী, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৬৫৮)

আবদুল মুত্তালিব কয়েকজন কুরাইশ নেতা নিয়ে আবরাহার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সুন্দর চেহারার ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। আবরাহা তাকে দেখে প্রভাবিত হলো। তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করল। তাকে সমান আসনে বসাল। কথাবার্তা শুরু হলে আবদুল মুত্তালিবের প্রাঞ্জল ভাষা ও বাগ্মিতায় আরও প্রভাবিত হলো সে। আলোচনার ফাঁকে তিনি নিজের উটগুলো ছেড়ে দিতে বললেন। আবরাহা বেশ আশ্চর্য হলেন। বললেন, ‘কী উদ্ভুত ব্যাপার! তোমার আবেদন শুনে বিস্মিত হয়েছি। তুমি উট ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে, অথচ কাবাঘর- যা আমি ধ্বংস করতে এসেছে। যা তোমার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র। যা তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের কাবা এবং এটিই তোমার দ্বীন। এ ব্যাপারে তুমি কিছুই বললে না। উদ্বিগ্নও হলে না।’

আবদুল মুত্তালিব বললেন, ‘বাদশাহ, উটের মালিক আমি, তাই এ নিয়ে চিন্তা করেছি। কাবাঘর আমার নই। এটি আল্লাহর ঘর। তিনিই এর রক্ষক। তিনি জানেন, তাঁর এ ঘর কিভাবে রক্ষা করতে হবে।’ কথাবার্তা শেষে উটগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হলো। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৬৪)

ফিরে এসে নিজের উটগুলো কাবা শরিফে মান্নত করে দিলেন আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশদের জড়ো করলেন। আবরাহার সঙ্গে তার কী আলোচনা হয়েছে, তা জানিয়ে বললেন, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এ কাবা আল্লাহর ঘর। তিনিই এর হেফাজত করবেন। তোমরা বাড়িঘর ছেড়ে মাঠে-ময়দানে বেরিয়ে পড়ো। যাতে এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে না হয়।’

মক্কাবাসী পাহাড়ে যাওয়ার আগে আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে কাবাঘরের পাশে জড়ো হলেন। বায়তুল্লাহর চৌকাঠ ধরে তারা সবাই দোয়া করলেন। কান্না করলেন। আল্লাহর সাহায্য চাইলেন। বললেন, ‘হে আল্লাহ, এ বিষয়ে আমরা চিন্তিত নই, আমরা যখন আমাদের ধন-সম্পদ রক্ষা করতে পারি, তখন তোমার সম্পদ (কাবা) অবশ্যই তোমাকে রক্ষা করতে হবে। তোমার রক্ষণাবেক্ষণের ওপর ক্রুশশক্তি জয়ী হতে পারবে না এবং ক্রুশের পূজারীদেরও কোনো সাধ্য নেই। তবে হ্যাঁ, তুমি নিজেই যদি তাদেরকে তোমার ঘর ধ্বংস করতে দাও, তবে আমরা আর কী। তোমার মন যা চায় তুমি তা-ই করো।’ (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৬৫-১৬৬)

এ সময় আবদুল মুত্তালিব কেঁদে কেঁদে কবিতা নিবেদন করলেন আল্লাহর কাছে- ‘হে আল্লাহ, একজন দাসও তার দলবলকে রক্ষা করে। সুতরাং তুমি তোমার বিধিসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত সম্পদ ও লোকজনকে রক্ষা করো। ওদের ক্রুশ ও শক্তি যেন তোমার প্রতাপ ও পরাক্রমের ওপর জয়যুক্ত না হয়। আমাদের কিবলা যদি তুমি শত্রুর করুণার ওপর ছেড়ে দিতে চাও, তা হলে যা খুশি করো।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)

আবরাহা ছিল অত্যন্ত ভোগবিলাসী ও প্রবৃত্তি পূজারি। সে দেখল, আরবের লোকেরা কাবা শরিফে যাতায়াত করে। বিভিন্ন দেশের লোকেরাও সেখানে জিয়ারত ও ইবাদত করতে যায়। এ ঘর ঘিরে আছে তাদের উৎসব আয়োজন ও হজের মতো পবিত্র ইবাদত। এ ঘরের সম্মান তাদের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এটি সে মেনে নিতে পারল না। সে কাবার মহিমা, জনপ্রিয়তা ও সম্মান ভূলুণ্ঠিত করতে চাইল। ইয়েমেনের সানআ শহরে নির্মাণ করল জাঁকজমকপূর্ণ সুরম্য গির্জা। সব ধরনের সৌন্দর্য ও কারুকার্য দিয়ে আকর্ষণীয় করা হলো গির্জা। নাম দিল কাবা। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারেরও কেন্দ্র ঘোষণা করল একে। সে চাইল মানুষ এখানে এসে জিয়ারত করুক। হজ করুক।

গির্জা ঘিরে মেলা বসাল। শাহি ফরমান জারি করল, কেউ যেন মক্কায় না যায়। এখানে যেন হজ করে। তার ইচ্ছা ভেস্তে গেল। চাওয়া পেল না পূর্ণতা। শাহি ফরমান কাজে এল না। প্রভাবও ফেলল না। লোকজন সানআর গির্জামুখী হলো না। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, মূল: মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভী, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৬৫৭)

আবরাহার বিষয়টি আরবের লোকেরা বেশ গুরুতর মনে করল। তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ল। মালেক ইবনে কিনানা গোত্রের এক লোক ইয়েমেনে গেল। সানআর গির্জায় প্রবেশ করে মলমূত্র ত্যাগ করল। কেউ কেউ বলেন, কোনো এক মেথর (ঝাড়ুদার) রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে গির্জায় ঢুকে পায়খানা করে তা জায়গায় জায়গায় মেখে দিল। এর কয়েক দিন পর তাতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। আবরাহা তার এই পবিত্র উপসনালয়ের বেইজ্জতি দেখে ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠল। সে মক্কার কাবাঘর ধ্বংসের মনস্থ করল। জড়ো করল বাহিনী। হাবশিদের নিয়ে মক্কার পথে রওনা দিল। সঙ্গে ছিল হাতি। (আল কুরআনের ভৌগোলিক ইতিহাস, সাইয়েদ সুলাইমান নদভি, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩১)

আবদুল মুত্তালিব বিপুল বেদনা নিয়ে দোয়া শেষ করলেন। কুরাইশদের নিয়ে চললেন নগরী ছেড়ে নিকটস্থ পাহাড়ে। বুকের ভেতর ভাঙচুর আর কাবা হারানোর শঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন, কী ঘটে!

আবরাহা পর দিন সকালে তার সেনাবাহিনীকে সামনে অগ্রসর করাল। প্রথম সারিগুলোতে হস্তীবাহিনী, পেছনে বিরাট পদাতিক বাহিনী। বাহিনী মক্কায় পৌঁছানোর আগেই তাদের মাথার ওপর শূন্যমণ্ডল ছেয়ে ফেলল ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ পাখি। পাখিদের ঠোঁট ও পায়ে তিনটি করে ছোট ছোট পাথর। একটি ঠোঁটে ও দুটি পায়ে। পাখিরা সেনাদের ওপর ওইসব পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করতে লাগল। যার গায়েই ওই পাথরখণ্ড লাগল, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খসে পড়ল। এভাবে তারা সবাই ধ্বংস হলো। (তারিখ আত-তাবারি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৫১-৫৫৭)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতিম (রহ.) উবাইদ বিন উমাইরের রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন, আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হলে প্রচণ্ড বাতাস প্রবাহিত হলো। বাতাসের সঙ্গে সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এল। পাখিরা সেনাবাহিনীর ওপর ছেয়ে গেল। তাদের ঠোঁটে ও দুই পায়ে পাথরখণ্ড। পাখিগুলো প্রথমে শব্দ করল। তারপর আবরাহার সেনাবাহিনীর ওপর পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র বাতাস প্রবাহিত হলো। তা পাথরবর্ষণকে সৈন্যদের জন্য ভয়ংকর বিপদ সৃষ্টি করে দিল। যে সৈন্যের ওপরই পাথর পড়ল, তার শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেল এবং দেহ পচে-গলে পড়তে লাগল। এভাবে পাখিদের পাথরখণ্ড গোটা সেনাবাহিনীকে ঝাঁঝরা করে দিল। তারা হয়ে গেল তৃণসদৃশ। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৬৬-১৬৭)

কেউ বলেন, আবরাহা তাৎক্ষণিক মারা যায়নি। মারাত্মক বিষাক্ত বসন্ত রোগ পেয়ে বসল তাকে। ফলে দেহের এক একটি গ্রন্থি পচে-গলে খসে পড়তে লাগল। রক্ত আর পুঁজ ঝরতে লাগল। একপর্যায়ে বুক ফেটে মারা গেল। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, মূল: মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভী, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৬৫৯)

পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি দেখোনি তোমার প্রতিপালক হাতি-অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান, যারা তাদের ওপর পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করে। এরপর তিনি তাদের ভক্ষিত তৃণসদৃশ করেন।’ (সুরা ফিল, আয়াত: ১-৫)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ওই পাখিগুলোর চঞ্চু ছিল পাখির মতো এবং নখ ছিল কুকুরের মতো। ইমাম ওয়াকিদি (রহ.) বলেন, পাখিগুলো ছিল সবুজ রঙের। ওগুলো কবুতরের চেয়ে কিছু ছোট ছিল। পায়ে রং ছিল লাল। ইকমিরা (রহ.) বলেন, সবুজ রঙের এই পাখিগুলো সমুদ্র থেকে বের হয়ে এসেছিল। ওগুলোর মাথা ছিল জন্তুর মতো। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ৮)

কোরআনের ১০৫ নম্বর সুরায় এ ঘটনার বিবরণ আছে। কোরআনে এ ঘটনাকে ‘আসহাবুল ফিল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরবে এ বছরকে হামলার বছর বলা হতো। এ ঘটনার ৫০ থেকে ৫৫ দিন পৃথিবীর কোল আলো করে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম হয়।