• আজ

কলকাতার পূজামণ্ডপে পদদলন: যেভাবে ঘটল এই ঘটনা

কলকাতার পূজামণ্ডপে পদদলন: যেভাবে ঘটল এই ঘটনা

সপ্তমীর রাতে কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপূজার মণ্ডপে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি, প্রবেশ ও বের হওয়ার সংকীর্ণ পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় মাইকে দেওয়া সতর্কবার্তা; সব মিলিয়ে এ মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার কয়েক দিন আগেই মণ্ডপের প্রবেশপথ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল।

ভারতের কলকাতায় দুর্গাপূজার অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে এ পদদলনের ঘটনা ঘটে। উত্তর কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত মণ্ডপটি হাওড়া সেতু থেকে দুই কিলোমিটারেরও কম দূরে। এটি কলকাতার প্রাচীন দুর্গাপূজার আয়োজনগুলোর একটি।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা হাইকোর্টের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, পূজার আয়োজকদের দায় আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তাদের দাবি, আয়োজকদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত।

টানা বৃষ্টিতে মণ্ডপে ভিড়, মুহূর্তেই পদদলন

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে পড়লেও সপ্তমীর উৎসবে মানুষের উপস্থিতি কমেনি। বরং বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেকে চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে আশ্রয় নেন। ভেতরে থাকা দর্শনার্থীরা বৃষ্টির মধ্যে বের হতে চাইছিলেন না। এদিকে প্রবেশ ও বের হওয়ার একই পথে আরও মানুষ ঢুকতে থাকেন।

একপর্যায়ে কয়েকজন পিছলে পড়ে গেলে তাদের ওপর অন্যরা পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

এএনআইকে প্রত্যক্ষদর্শী বিনয় কুমার বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় ছিল এবং বৃষ্টির মধ্যে কেউ বের হতে চাইছিলেন না। পুলিশ প্রশাসন সক্রিয় থাকলেও আকস্মিক ভিড় সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী উত্তম বলেন, খবর পাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তার দাবি, পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় বিধায়কও আহতদের চিকিৎসা ও হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত ছিলেন। বৃষ্টি থেকে নিজেদের ও সন্তানদের রক্ষা করতে গিয়ে মানুষ মণ্ডপে ভিড় করেছিলেন বলে মনে করেন তিনি।

সরু গলি ও প্রবেশপথ নিয়ে আগেই উঠেছিল প্রশ্ন

ঘটনাস্থলের বিভিন্ন দৃশ্যে মণ্ডপের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক এবং সেখানে যাওয়ার রাস্তা বেশ সংকীর্ণ দেখা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা, এই সীমাবদ্ধতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে।

ঘটনার পাঁচ দিন আগে ‘ফ্যামগার্ল’ নামে এক ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী মণ্ডপটির একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে মণ্ডপের বিশাল পরিসর থেকে দর্শনার্থীদের একটি সরু পথ দিয়ে প্রতিমার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পথটি বাঁকানো এবং একসঙ্গে বড়জোর তিনজনের চলাচলের উপযোগী বলে ভিডিওতে মন্তব্য করা হয়।

ভিডিওতে ওই ব্যবহারকারী বলেন, এত বড় মণ্ডপ হওয়া সত্ত্বেও প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশপথের তুলনায় ভিআইপি প্রবেশপথ অনেক বড় বলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন। সপ্তমী ও অষ্টমীতে এত মানুষের ভিড় হলে কী ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

পিটিআইয়ের বরাতে এক পুলিশ কর্মকর্তাও বলেছেন, অব্যবস্থাপনার কারণে পদদলনের সময় মানুষ প্রবেশপথ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। ফটক ও মণ্ডপে যাওয়ার রাস্তা; দুটিই সংকীর্ণ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, প্রবেশ, বের হওয়ার পথ এবং মানুষের চলাচল নিয়ে মাইকে দেওয়া পরস্পরবিরোধী ঘোষণায় দর্শনার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তাদের আরও দাবি, মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল না; নিরাপত্তাকর্মীদের বড় অংশ ভিআইপি প্রবেশপথের কাছে অবস্থান করছিলেন।

চোরবাগান এলাকার বাসিন্দা সংঘমিত্রা বাউমিক বলেন, এ বছর পর্যাপ্ত পুলিশ উপস্থিতি তিনি দেখেননি। তার মতে, এর ফলে অব্যবস্থাপনা বেড়েছে।

আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী।

দুর্ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা

এ ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, পূজার আয়োজকদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের দায় আড়াল করার চেষ্টা চলছে।

মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (এমএআইটিসি) অভিযোগ করেছে, চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অধিকারীর ভাতিজা দেবদীপ অধিকারীর যোগসূত্র রয়েছে। তাকে কবে গ্রেপ্তার করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

দলটির মুখপাত্র ও কলকাতার বিধায়ক কুণাল ঘোষের অভিযোগ, পদদলনের ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটিকে এর দায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনা প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটিকে এর দায় নিতে হবে। এর সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। তবে এই মুহূর্তে আমরা হাসপাতালে রয়েছি। গতকাল সন্ধ্যা থেকে আমাদের অগ্রাধিকার হলো উদ্ধারকাজ ও আহতদের চিকিৎসা।’

তবে অভিযোগের জবাবে বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র ও পার্শ্ববর্তী কাশীপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্রের বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারি বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর কোনো আত্মীয় পূজা কমিটির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা তিনি জানেন না। তবে কেউ যুক্ত থাকলেও তার উপস্থিতিতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটুক, এমনটা কি তিনি চাইতেন?

তিওয়ারি আরও বলেন, কয়েক দশক ধরেই তৃণমূল নেতাদের মধ্যে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অরূপ বিশ্বাস ও ফিরহাদ হাকিম বিভিন্ন সর্বজনীন দুর্গাপূজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিজেপির কিছু নেতাও বিভিন্ন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এতে আপত্তির কী আছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মণ্ডপের প্রবেশপথের সংকীর্ণতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং বৃষ্টির মধ্যে মানুষের চলাচল সামাল দিতে না পারার মতো বিষয়গুলো এ প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।