
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বদলে যেতে পারে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তদন্ত, সরকারি ব্যয়ে নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতির বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর ট্রাম্পকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করেই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট না হলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটি এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টির জন্য ভোট দেবেন মার্কিন ভোটাররা। বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
তদন্তের মুখে পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে কংগ্রেসের তদন্ত ও নজরদারির ক্ষমতায়। বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব চলে যাবে তাঁদের হাতে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, সরকারি অর্থ ব্যয়, অভিবাসন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন তাঁরা।
কংগ্রেসের কমিটিগুলো শুনানি আয়োজন, নথিপত্র তলব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাবে। প্রয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও শুনানিতে হাজির হতে হতে পারে। তবে সমন জারি করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হাজির করা নিশ্চিত নয়; এ নিয়ে আইনি বিরোধও তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার সাংবিধানিক ক্ষমতাও থাকবে ডেমোক্র্যাটদের। তবে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হলেই প্রেসিডেন্টকে পদ ছাড়তে হয় না। এরপর সিনেটে বিচার হয় এবং দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
সিনেট হারালে আটকে যেতে পারে নিয়োগ
রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনের দায়িত্ব সিনেটের।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে এসব মনোনয়ন আটকে দিতে বা অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারবেন। বিশেষ করে ফেডারেল বিচারক নিয়োগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, দেশটির ফেডারেল বিচারকেরা সাধারণত আজীবন দায়িত্ব পালন করেন।
বাজেট ও সরকারি অর্থায়নে অচলাবস্থার শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সরকারি ব্যয় অনুমোদন করা। ফলে প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে দুই দলের বিরোধ বাড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি, প্রতিরক্ষা খাত এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির অর্থ বরাদ্দ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা আপত্তি তুলতে পারেন। বাজেট ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল নিয়ে সমঝোতা না হলে সরকারি কার্যক্রমে অর্থসংকট তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থার কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
এ ছাড়া জাতীয় ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো নিয়েও নতুন করে দর-কষাকষি শুরু হতে পারে। ২০২৭ সালে সরকারি অর্থায়ন ও ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ, ইতিহাস যা বলছে
ট্রাম্পের নীতিতে বাধা দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা?
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, বাণিজ্য ও সরকারি ব্যয়ের মতো বিষয়ে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে তাঁকে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের সব নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। শুল্কনীতি, অভিবাসন এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসন নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপেরও আইনি ও সাংবিধানিক সীমা রয়েছে। আদালত চাইলে নির্বাহী আদেশের বৈধতা পর্যালোচনা করে তা স্থগিত করতে পারেন।
১ নভেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে কীভাবে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসন পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে হোয়াইট হাউস আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য তদন্ত ও নথি তলবের বিষয়েও প্রশাসনের আইনজীবীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও পূর্ণ ক্ষমতা নয়
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোনো বিলের ওপর ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন।
এ ছাড়া সিনেটে অধিকাংশ সাধারণ আইন পাসের ক্ষেত্রে বিতর্ক শেষ করতে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হয়। ফলে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।
অর্থাৎ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। ফলে নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি বিরোধও বাড়তে পারে।























