
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, আল-সাইয়েদ দুই লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে সিনেটের উচ্চকক্ষে জায়গা করে নিলেন তিনি।
স্থানীয় দৈনিক ডেট্রয়েট নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগানের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতিফলন ঘটেছে এই নির্বাচনেও। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিশিগানে অল্প ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
৪২ বছর বয়সী আবদুল আল-সাইয়েদ মিশিগানের অ্যান আরবারের বাসিন্দা। তিনি ডেট্রয়েট ও ওয়েন কাউন্টির সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। মার্কিন রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব ও সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সমালোচক আল-সাইয়েদ শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ চালুর পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।
মিশরীয় বংশোদ্ভূত এই প্রগতিশীল রাজনীতিক অবসরপ্রাপ্ত ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তার এই জয়কে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় তার এই নির্বাচন। স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে দলের ভেতরে মতপার্থক্য ছিল প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয়।
শৈশব ও শিক্ষা
মিশিগানের রচেস্টার হিলসে মিশরীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম আবদুল আল-সাইয়েদের। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করেছেন। ২০০৭ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর ২০১১ সালে রোডস স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট করেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০১৫ সালে মিশিগানের বৃহত্তম শহর ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন আল-সাইয়েদ। আর্থিক সংকটের পর শহরটির জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেনাসেবা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল-সাইয়েদ। এই কাউন্টির আওতাধীন এলাকা হলো ডেট্রয়েট।
রাজনৈতিক উত্থান ও ঐতিহাসিক সিনেট নির্বাচনের প্রচেষ্টা
২০২৬ সালে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসেন আল-সাইয়েদ। আগস্টে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন তিনি। তার নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানান সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং মিশিগানের প্রতিনিধি রাশিদা তালিবের মতো প্রভাবশালী প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা।
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচি চালু, আবাসন ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব হ্রাস এবং শ্রমজীবী পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালান তিনি।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমর্থনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পান আল-সাইয়েদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধের আহ্বান জানান। নির্বাচনী প্রচারের সময় ইসরায়েল নিয়ে তার অবস্থান বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়।
ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত হওয়া হ্যালি স্টিভেন্স সাধারণ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আল-সাইয়েদের নির্বাচনী বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেন।
স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা দেখা দেয়। তবে তা আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারে বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
মুসলিম পরিচয় নিয়ে ট্রাম্পের আক্রমণ
২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মাইক রজার্স। সে সময় অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প জয় পেলেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান তিনি।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রজার্স আল-সাইয়েদকে উগ্রপন্থি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এর জবাবে আল-সাইয়েদ মুসলিম ব্রাদারহুড নামের একটি ইসলামপন্থি সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকার অভিযোগের বিরোধিতা করেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রচারণার অংশ হিসেবে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দুজনই মিশিগান সফর করেন। সেখানে ট্রাম্প আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তাকে ‘সহিংস সন্ত্রাসী’ বলেও আখ্যা দেন তিনি। তবে পরে রজার্স ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে অস্বীকৃতি জানান।
এছাড়া ট্রাম্প আল-সাইয়েদকে ‘মোহাম্মদ’ নামে সম্বোধন করেন।
এর জবাবে আল-সাইয়েদ বলেন, তিনি আমার নাম কীভাবে উচ্চারণ করেন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনকি তিনি আমার পুরো নাম মনে রাখলেন কি না, সেটিও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ নভেম্বরের পর তিনি আমাকে শুধু ‘সিনেটর’ বলেই সম্বোধন করতে পারবেন। আপনার কাছে আমি সিনেটর মোহাম্মদ হয়েই থাকব।
তার এই জয় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এর আগে মুসলিম আমেরিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালন করলেও সিনেটে কোনো মুসলিম নির্বাচিত হননি। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হন। পরে ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।























