• আজ

আতারি-ওয়াঘা থেকে নেপালের কী শেখার আছে? ডা. সুনীল আচার্য

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবস্থিত আতারি-ওয়াঘা সীমান্ত কেবল দুটি দেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমারেখা নয়; এটি জাতীয়তাবোধ, সামরিক শৃঙ্খলা, জাতীয় পতাকা এবং দেশের প্রতি গর্ব ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি প্রতীকী স্থান হয়ে উঠেছে।

ভারতের অমৃতসরের কাছে আতারি এবং পাকিস্তানের দিকে ওয়াঘা সীমান্তে প্রতিদিন অনুষ্ঠিত ‘বিটিং দ্য রিট্রিট’ অনুষ্ঠানে উভয় দেশের নিরাপত্তারক্ষীরা সামরিক কুচকাওয়াজ, পতাকা অবতরণ এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি উপস্থাপন করেন।

১৯৫৯ সাল থেকে চালু হওয়া এই অনুষ্ঠান কেবল সামরিক মহড়া নয়; বরং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের আবেগিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমমূলক আয়োজনেও পরিণত হয়েছে। সীমান্তে উভয় দেশের নিরাপত্তারক্ষীরা কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে মার্চপাস্ট, আনুষ্ঠানিক অভিবাদন এবং জাতীয় পতাকা অবতরণ করেন।

এই অনুষ্ঠান দেখতে বিপুলসংখ্যক নাগরিক ও পর্যটক সেখানে উপস্থিত হন। এর মাধ্যমে সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আবেগিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আতারি-ওয়াঘা অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দ্বৈত বার্তা। একদিকে সামরিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের শক্তি, শৃঙ্খলা ও আত্মমর্যাদা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের শেষে দুই দেশের সৈন্যদের আনুষ্ঠানিক অভিবাদন এবং একই সময়ে জাতীয় পতাকা অবতরণের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মানের বার্তাও প্রকাশ পায়।

নেপালও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

নেপালের আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভারত ও চীনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সীমান্তকে নাগরিকদের জাতীয়তাবোধ, ইতিহাস, নিরাপত্তা সচেতনতা এবং পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়মিত জনসম্মুখে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রচলন অত্যন্ত সীমিত।

সীমান্ত এলাকায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশের আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ, জাতীয় সংগীত, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপস্থাপনা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানানোর মতো কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।

এ জন্য ভারতের সঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন কাঁকরভিট্টা, বীরগঞ্জ, ভৈরহবা, নেপালগঞ্জ ও ধনগড়ির মতো প্রধান স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে ‘সীমান্ত জাতীয় গৌরব অনুষ্ঠান’ শুরু করা যেতে পারে।

চীনের সঙ্গে সীমান্তেও সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুরূপ কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর উদ্দেশ্য প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ প্রদর্শন করা নয়; বরং নেপালের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দেশের প্রতি নাগরিক দায়িত্ববোধকে ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হওয়া উচিত।

এ ধরনের অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটক এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সীমান্ত এলাকায় নেপালের ইতিহাস, মানচিত্র, জাতীয় ব্যক্তিত্ব, নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা এবং স্থানীয় সংস্কৃতিবিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করা সম্ভব। এতে সীমান্ত এলাকা কেবল যাতায়াত ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে নয়, জাতীয় পরিচয় ও গৌরবের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

তবে আতারি-ওয়াঘার হুবহু অনুকরণ নেপালের জন্য উপযুক্ত হবে না। ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহাসিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নেপালের সীমান্তসংক্রান্ত সংবেদনশীলতা ভিন্ন। তাই নেপালের উচিত শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নাগরিক অংশগ্রহণ, জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান এবং সীমান্তকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা গ্রহণ করা।

জাতীয়তাবাদ কেবল স্লোগানে নয়, আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তাকর্মী, জাতীয় পতাকার নিচে দাঁড়ানো নাগরিক এবং নিজের দেশের ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে গর্বিত নতুন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা গেলে এ ধরনের অনুষ্ঠান কেবল কুচকাওয়াজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার একটি উন্মুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

নেপাল এভাবে ধাপে ধাপে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করতে পারে।

প্রথম ধাপ : ধারণা ও গবেষণা

প্রাথমিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন, শিক্ষা এবং ফেডারেল বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কর্মদল গঠন করা যেতে পারে।

কর্মদলকে ভারত ও চীনের সঙ্গে সংযুক্ত সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলোর নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা, অবকাঠামো, পর্যটন সম্ভাবনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে হবে। এ পর্যায়ে ‘নেপাল সীমান্ত জাতীয় গৌরব অনুষ্ঠান পরিচালনাসংক্রান্ত কার্যবিধি’ তৈরি করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপ : পরীক্ষামূলক কর্মসূচি

গবেষণার পর সবচেয়ে উপযুক্ত এক বা দুটি সীমান্ত এলাকা নির্বাচন করে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে সীমান্তে কাঁকরভিট্টা, বীরগঞ্জ অথবা ভৈরহবার মতো প্রধান স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা যেতে পারে।

চীনের সীমান্তেও নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি উপযুক্ত এলাকা নির্বাচন করা যেতে পারে।

এ জন্য প্রতিদিন বড় ধরনের সামরিক প্রদর্শনীর প্রয়োজন নেই। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে এক দিন অথবা বিশেষ কোনো দিবসে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একটি জাতীয় অনুষ্ঠানই যথেষ্ট হতে পারে।

এতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, নিরাপত্তা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক মার্চপাস্ট, সীমান্ত সুরক্ষায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মাননা এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

তৃতীয় ধাপ : বিদ্যালয় ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ

পরীক্ষামূলক কর্মসূচি সফল হলে এটিকে শিক্ষা ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সীমান্ত শিক্ষা সফর’ চালু করা যেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের নেপালের মানচিত্র, সীমান্তের ইতিহাস, সীমান্ত স্তম্ভ, সংবিধানে স্বীকৃত সার্বভৌমত্ব এবং সীমান্ত