
রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নিজস্ব জমি রয়েছে। সেই জমিতে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে ছিলেন নিউগিনি প্রোপার্টিজের চেয়ারম্যান মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া। বাধা দূর করতে মহিউদ্দিন দায়িত্ব দেন শাহরিয়ার মাহমুদকে। তাবলিগ জামাতে গিয়ে দুজনের পরিচয়।
দায়িত্ব পেয়ে শাহরিয়ার অস্ত্রশস্ত্রসহ শতাধিক লোক নিয়ে গত শনিবার রাতে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। হামলার ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেছেন নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া। সোমবার পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাদের মধ্যে পাঁচজন হলেন- শাহরিয়ার মাহমুদ, মামুন, আসলাম, মুন্না, শাহ আলম অনিক। পরে নিউগিনি প্রোপার্টিজে হামলার ঘটনায় সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। আব্দুল গফুর জামায়াতের এমপি।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ঢাকার পশ্চিম মাটিকাটা এলাকায় এমপির বাসা থেকে মিজানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি গুলশান বিভাগের একটি দল। এ সময় এমপি বাসাতেই ছিলেন। তার সামনে থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে ডিবি। তিনি রাতের আঁধারের হামলা মামলার ৯ নম্বর আসামি।
মামলার এক নম্বর আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শাহরিয়ারকে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং একসময় প্রজন্ম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যরা শ্রমিক শ্রেণির এবং ভাসানটেক বস্তিতে বসবাস করেন।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। এর মধ্যে হামলার অন্যতম হোতা শাহরিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মহিউদ্দিনের হয়ে এই হামলার নেতৃত্ব দেন।
শাহরিয়ারের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, তিনি তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত। একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন বলেও জানতে পেরেছি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই হামলার অন্যতম কারিগর তিনি। মামলার আরেক আসামি মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে এই হামলা করেছেন বলে জানতে পেরেছি।
তিনি বলেন, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস, কারা অংশ নিয়েছিল—সব বিষয়েই তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান চলমান আছে।
মামলার আরেক আসামি আবুল কাশেম সম্পর্কে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া হামলায় অংশ নেওয়া ইব্রাহীমসহ কয়েকজন স্থানীয় যুবদলের কর্মী বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও হামলায় সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত দেবনাথ বলেন, হামলায় অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীদের মধ্যে কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও পাঁচটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব মামলার মধ্যে জমি দখল-সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে জানতে নিউগিনি প্রোপার্টিজের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়াকে কল করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, নিউগিনি প্রজেক্টের ভেতরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জমি রয়েছে; কিন্তু সেই জমিতে তিনি যেতে পারেন না। চারদিক থেকে বাউন্ডারি করে আটকে রেখেছেন নাজিম। এ নিয়েই বিরোধ চলছিল।
পুলিশ বলছে, নিউগিনির মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মামলা রয়েছে। জমির দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এই হামলা হয়েছে।
থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি ঘটনাটি ছায়া তদন্ত করছে। ডিবি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আমাদের টিম কাজ করছে।
গত শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের কার্যালয় ও আশপাশের স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। ওই স্থাপনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ও রয়েছে। এ ঘটনায় পরদিন রোববার আবাসন প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। হামলায় কয়েকজন আহত হওয়াসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট ও দেড় কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ লুটপাট হয়েছে।























