
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়ায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, কয়েকটি ক্ষেত্রে মামলা ও বিভাগীয় কার্যক্রমের তথ্য রয়েছে।
বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের মতিঝিল কাস্টমস হাউসে উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দায়িত্ব পালনকালে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ দাবি করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছর আখাউড়ায় একটি সুপারশপে অভিযান চালিয়ে পণ্য জব্দের ঘটনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পণ্য খালাসে অনিয়ম ও চোরাচালানে সহায়তার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের পরও তাঁর মতিঝিল কাস্টমসে পদায়ন নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবদুল আহাদের সঙ্গে তৎকালীন কয়েকজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সানজিদা খানমকে তিনি বড় বোন হিসেবে সম্বোধন করতেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া তৎকালীন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে তিনি প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি বিএনপিপন্থী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন বলেও কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টার সাবেক শিক্ষার্থী পরিচয় ব্যবহার করে এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হওয়ার জন্য তদবিরের অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে বিক্ষোভ
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমসের তৎকালীন সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে কর্মচারীদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা ঘটে।
১৬ জানুয়ারি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ফাইল যাচাইসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা তাঁর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। এ সময় নামফলক ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
দৈনিক প্রথম আলোতে ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করা হয়।
পোস্তগোলায় অভিযানে অনিয়মের অভিযোগ
২০২১ সালের মার্চে ঢাকা কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পোস্তগোলার একটি রেস্তোরাঁয় অভিযানের ঘটনা নিয়েও অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযানের সময় সিসিটিভি ফুটেজে দলবল নিয়ে অনিয়ম, কর্মীদের মারধর এবং জব্দ করা পণ্যের হিসাবসংক্রান্ত অসংগতি দেখা যায়। এ ঘটনায় আদালতে মামলা হওয়ার তথ্যও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগে মামলা
২০২৪ সালের ২৫ জুন দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা কর, শুল্ক ও আবগারি বিভাগের উপকর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ ওঠে।
মো. রাশেদুল হক নামের ওই ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, অর্থ না দিলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আখাউড়ায় পণ্য জব্দ নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের ২৫ জুন দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে আখাউড়ায় একটি সুপারশপে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের অভিযানের তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবদুল আহাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে সুপারশপের বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ করা হয়। সুপারশপ কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, তারা সরকারি নিলামের মাধ্যমে বৈধভাবে পণ্য কিনেছিল। এরপরও পণ্য জব্দ করায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়।
এ ঘটনায় জব্দ করা পণ্যের বৈধতা এবং অভিযানের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিভাগীয় মামলায় অব্যাহতির তথ্য
আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(গ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
তিনি লিখিত জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর তাঁর দেওয়া জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় অভিযোগ প্রত্যাহার করে বিধিমালার ৭(২)(ক) অনুযায়ী তাঁকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মতিঝিল কাস্টমসে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও বিতর্কের মুখে থাকা একজন কর্মকর্তাকে কীভাবে আবার মতিঝিল কাস্টমসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের করা মামলার বর্তমান অবস্থা, আগের কর্মস্থলের অভিযোগ এবং নতুন করে জমা পড়া লিখিত অভিযোগের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তাঁদের প্রশ্ন, অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত দায়িত্বে বহাল রাখা কতটা যুক্তিসংগত?
ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যবসায়ীদ
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভ্যাট ও কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তার অভিযান এবং পণ্য জব্দের প্রক্রিয়ায় তাঁদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযানের নামে হয়রানি, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন জব্দ এবং জরুরি কাগজপত্র তল্লাশির অভিযোগও রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজস্ব আদায় সরকারের দায়িত্বের অংশ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট ও কর দিতে আগ্রহী। তবে রাজস্ব আদায়ের নামে যেন ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
এনবিআরের করণীয় কী?
রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ, আদালতে দায়ের করা মামলা, বিভাগীয় কার্যক্রম এবং সাম্প্রতিক লিখিত অভিযোগের বিষয়গুলো পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা, মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।
এনবিআর কি এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? মতিঝিল কাস্টমসে তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালন নিয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে রাজস্ব প্রশাসনের জবাবদিহি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
সূত্র : বর্তমান দেশ






















