
প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে ছয় মাস পার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির চতুর্থ চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল চার যুগ পূর্ণ করে উনপঞ্চাশে পা দিচ্ছে আজ ১ সেপ্টেম্বর। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন আর ভাঙা-গড়ায় ৪৮ বছরের পূর্ণ যৌবনে উপনীত হয়েছে দলটি। ম্যাপরেফারেন্স দেখা
পঞ্চমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। এমন একটি সময়ে চার যুগ পূর্ণ করেছে, যখন দীর্ঘ প্রায় কুড়ি বছরের ঘোর অমানিশা কাটিয়ে ক্ষমতার নাগাল পেয়েছে। দুবছর আগে আগস্ট মাসের ৫ তারিখে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় এক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সুদিনের মুখ দেখে বিএনপি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে গেল ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে। সরকারের ৬ মাসেও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গোড়াপত্তন করেন, তা অর্জনে মরহুম চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি ও বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে পরিচালিত বিএনপি কতটা সফল বা বিফল তা বিচার-বিশ্লেষণ হতে পারে। তার আগে কোন পটভূমিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠা, তা নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করা যাক।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এ দেশের মানুষ তৎকালীন শাসকশ্রেণির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিপীড়নে অতিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বিশৃঙ্খলা, দুর্ভিক্ষ ও একদলীয় শাসনের নাগপাশে বন্দি হয়ে পড়ে। স্বাধীন সংবাদপত্র ও বিচারব্যবস্থা বাকশালী শাসনের অক্টোপাসে আবদ্ধ হয়ে যায়। এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও মহান মুক্তি-সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। নাজুক ও টালমাটাল পরিস্থিতিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন। পরে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের সামগ্রিক অবস্থা যখন বিপর্যস্ত এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির সম্মুখীন, ঠিক তখন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বীরউত্তম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ।
তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে সামরিক শাসন অবসানের উদ্যোগই শুধু নেননি, দেশকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বহুদলীয় রাজনীতি চালুর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদ বসার আগেই দেশ থেকে সামরিক আইন তুলে নেন। মুজিব শাসনে বাকশাল গঠন, সংবাদপত্র ও মৌলিক অধিকার হরণ, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন এবং হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির ফলে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা পূরণের জন্য এবং স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালু করে দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা তখন এক ধরনের অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
সিপাহি জনতার মিলিত সমর্থনে স্বাধীনতার ঘোষক ও অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান বীরউত্তম যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, তখন দেশের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দুর্দান্ত সাহসিকতায় ভর করে দৃঢ় ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সমুজ্জ্বল রেখে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। আর তখন দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন পড়ে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের।
এরই প্রেক্ষাপটে জেনারেল জিয়াউর রহমান তার শাসনকে দ্রুত অসামরিকীকরণের লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তার পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে করা হয় এ দলের আহ্বায়ক। জাগদলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দলের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীন, জাতীয়, মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশ সুনিশ্চিত করার জন্য জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এমন একটি জাতীয় সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভব হচ্ছে যা কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও কর্মজীবী মানুষকে একতাবদ্ধ করে স্বাধীন জাতীয় বিকাশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। … জাগদলের মাধ্যমেই শুধু জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় বিকাশ সম্ভব।
জাগদল গঠনের পর একই বছর ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ১৩ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ছিলেন জাতীয় ফ্রন্টের জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। নির্বাচনে জেনারেল ওসমানীকে হারিয়ে বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জেনারেল জিয়াউর রহমান। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার অব্যবহিত পরই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিলুপ্তি ঘটে জাগদল ও ঐক্যফ্রন্টের।
ঘোষিত ১৯ দফাকেই নবগঠিত বিএনপির মূল আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। জিয়াউর রহমান প্রথমে দলের আহ্বায়ক ও পরে চেয়ারম্যান হন। প্রথম মহাসচিব হন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। মুক্তদ্বার নীতি গ্রহণ করে দলকে ব্যাপকভিত্তিক একটি জাতীয়তাবাদী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ দিতে রাষ্ট্রপতি জিয়া দক্ষিণপন্থি ও বামপন্থি মতাদর্শের রাজনীতিকদের স্বাগত জানান। তখন দলের প্রায় অর্ধেক নেতাকর্মী ও সদস্য ছিলেন রাজনীতিতে নবাগত ও তরুণ। দলের প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়Ñঅর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য ও জনগণের মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা সৃষ্টি। পাশাপাশি চারটি মূলনীতি ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালে গোটা জাতি ছিল বিভক্ত। আর এই বিভক্তি ডান, মধ্য ও বাম ইত্যাকার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতেই শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে বা করেনি কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বা বিপক্ষ শক্তি হিসেবেও। ফলে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সংস্কৃতিসেবীর মতো সামাজিক শক্তিগুলোও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আমলা এমনকি সামরিক বাহিনীও মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল এই বিভাজন দূরীকরণ এবং পুরো জাতি যাতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একক সত্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, সেজন্য বিবদমান গোষ্ঠী ও উপদলের একত্রীকরণ। জিয়াউর রহমান শুধু তার প্রতিষ্ঠিত দল নয়, বাকশালের কারণে বিলীন হয়ে যাওয়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ করে দেন। বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগকেও নিজ নামে রাজনীতি করার পথ সুগম করে দেন।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয় করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলকে দ্রুততম সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলতে সক্ষম হন। অতুলনীয় দেশপ্রেম ও সততা, অসীম কর্মোদ্দীপনা, জনগণের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাওয়ার অনন্য গুণে ক্যারিশমেটিক রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান মাত্র তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে সমাসীন করার পাশাপাশি স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করতে সক্ষম হন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে’র কালরাতে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদতবরণ করেন দেশের সবচেয়ে নন্দিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জাতি আবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়। সাময়িকভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়া বিএনপির রাজনীতির হাল ধরতে হয় গৃহবধূ খালেদা জিয়াকে। রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নবিস খালেদা জিয়াও স্বামী জিয়াউর রহমানের ঐক্য ও উন্নয়নের রাজনীতি এগিয়ে নেন। স্বৈরাচারবিরোধী বিরামহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নন্দিত নেত্রী হিসেবে অভাবনীয় উত্থান ঘটে খালেদা জিয়ার। সে সময় থেকে গত বছর ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমৃত্যু বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া খালেদা জিয়া।
স্বৈরশাসনবিরোধী ৯ বছরের লড়াকু সংগ্রামে আপসহীন নেত্রীর খেতাব পান খালেদা জিয়া। গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০-এর গণতন্ত্রায়ণের পর ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশে চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনটিতেই জয়লাভ করে। পরের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ছিল পাতানো ও প্রহসনের। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সেগুলো গ্রহণযোগ্য হয়নি। তার পরও একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ভয়ানক নিপীড়ন, প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে ভুলের চক্করে পড়ে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় বিএনপি জোট। ফলে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই তিনটি সংসদ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সদর্পে জারি রাখে ফ্যাসিবাদী শাসন। প্রতিদিনেরখবর পড়া
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স এখন ৫৫ আর বিএনপির বয়স ৪৮। ২০০৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে বলতে গেলে সবকিছুই ছিল বিএনপির প্রতিকূলে। দলের কান্ডারি চেয়ারপারসন মরহুম খালেদা জিয়া বানোয়াট মামলায় আর ফরমায়েশি সাজায় দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্তি মিললেও গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা ও সরকারি শর্তের জালে আটকে রাজনৈতিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে চলে যান না ফেরার দেশে।
বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ভয়াবহ নির্যাতন আর ক্ষমতাদর্পী নিষ্ঠুর শাসক শেখ হাসিনার রোষে পড়ে একাধিক মামলায় সাজা ও কয়েকটিতে পরোয়ানা মাথায় নিয়ে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান সতেরো বছর। মায়ের অসুস্থতা ও কারান্তরীণ সময়ে লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করেন তিনি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। মাত্র ১ মাস ২০ দিনের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দিয়ে একরকম বাজিমাত করেন তারেক রহমান। সরকার গঠন করেন দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে।
অনুকূল বা প্রতিকূল সবসময়ই বিএনপি ও জিয়া পরিবার বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কালজয়ী জাতীয়তাবাদী আদর্শ আর উন্নয়ন, উৎপাদন ও জনগণতান্ত্রিক রাজনীতিই বিএনপির মূল শক্তি। মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থাকে মূলমন্ত্র করে দুর্গম পথে সাহসী অভিযাত্রা ভয়াবহ রাজনৈতিক সুনামির মুখেও দলটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
তারেক রহমান বাবার প্রতিষ্ঠিত ও মায়ের হাতে ব্যাপকভিত্তিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠা দল বিএনপিকে স্বকীয় ধারায় পরিচালিত করতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশ পরিচালনায় তিনি গণমুখী ও জনতুষ্টিমূলক অনেকগুলো উদ্যোগ নিয়েছেন। বাবা জিয়াউর রহমান স্বল্পকালীন রাষ্ট্র পরিচালনায় যে অতুলনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন, তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য হতে পারে মডেল। এরই মধ্যে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীন ও উচ্চশীর নীতি অনুসরণে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্য আত্মোৎসর্গ করে গেছেন। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অনমনীয় প্রয়াস সুস্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ। বাংলাদেশকে তিনি জগৎসভায় পরিচিত করে তুলেছিলেন, দারিদ্র্যপীড়িত এই ছোট দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি কূটনীতির ক্ষেত্র নিয়ে এসেছিলেন পাদ-প্রদীপের আলোয়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির রাজনীতিটাও শহীদ জিয়ার দেখানো পথে এগিয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, রীতিনীতি, ব্যবস্থা ও মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিতে এসেও তিনি জনকল্যাণের রাজনীতির মূল সুরটি ধরতে পেরেছিলেন। উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমানও অন্তত তার সরকারের হানিমুনকালে জনকল্যাণমুখী রাজনীতি প্রাধান্য দিয়ে এগোতে দেখা গেছে।
শহীদ জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা বামও নই, দক্ষিণও নই। আমরা বাংলাদেশি।’ এ দেশের রাজনীতিতে স্বাধীন জাতীয় বিকাশের তাগিদ তার কাছে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল এবং তার রাজনীতি সেই কারণে জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও ইসলামি মূল্যবোধের ধারায় প্রবাহিত করেছিলেন। তারেক রহমানের কাছেও একই নীতি প্রত্যাশা করেন দেশপ্রেমিক আপামর জনগণ ও বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীলরা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, শোষিত-বঞ্চিত গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে তিনি উন্নয়নের মূল প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন। বাংলাদেশের খুব কম থানাই আছে, যেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার পা পড়েনি। গ্রামের মেঠোপথ ধরে তিনি হেঁটেছেন, নিজের চোখে মেখেছেন দারিদ্র্যক্লিষ্ট নিম্নবিত্ত মানুষের নিদারুণ কষ্টের রূপ। তার আগে শহুরে রাজনীতির আলোঝলমল অঙ্গন ছেড়ে আর কোনো রাজনীতিবিদ এমন সহজে গ্রামের মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াননি। ঘুমন্ত গ্রামগুলো তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। মূলত তার কারণেই গ্রামকে উপেক্ষা করে দেশে আর কারো পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব হয়নি, এখনো হচ্ছে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যেও সে ইতিবাচক-প্রবণতা ও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ইসলামিশিক্ষা অর্জন
দেশের রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সহনশীলতা বিরোধী শিবিরেও প্রশংসিত ছিল। জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দল-মতের মানুষকে ডাক দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জাতীয় ক্ষেত্রে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। বহুসংখ্যক রাজনৈতিক দল, বিরোধী সংবাদপত্র ও সংগঠন করার সুযোগ অবারিত করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তার প্রগাঢ় আস্থাই প্রমাণ করে। ব্যক্তিগতভাবে এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন সব দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। নিজের রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরও তিনি ছাড় দেননি। আত্মীয়স্বজন ও তোষামোদকারীদের কাছে ঘেঁষতে দেননি। বাবার এই গুণগুলোর দিকে তারেক রহমান বিশেষ নজর দেবেন এমন প্রত্যাশা করা অমূলক হবে না।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা থেকে খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে দক্ষ ও প্রাজ্ঞ এবং সৎ মানুষদের কাছে টেনেছিলেন। অনেকেই ছয় মাসের তারেক রহমানের সরকারে যাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাদের দক্ষতা, প্রজ্ঞা, সততার দিকটি সামনে এনে হতাশা প্রকাশ করছেন। এ দিকটির প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।
দারিদ্র্যপীড়িত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের সামনে চ্যালেঞ্জ ও বিড়ম্বনার দিকটা সবারই জানা। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা এবং সাধ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। বাইরের চাপ, ভেতরের সীমাবদ্ধতাÑসবকিছুর আবর্তে পড়ে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো আজও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজে মরছে। এই পরিচিত বাধার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের সমাজের আধুনিক, গতিশীল ও সমৃদ্ধ করে তুলতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই সৎ, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে তার উল্লেখযোগ্য সাফল্যই তাকে জনসাধারণের কাছে হিমালয়সম জনপ্রিয়তায় আসীন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবার এসব গুণকে গুরুত্ব দিলে ভালো করার সুযোগ আছে।
একজন দলীয় প্রধান, শাসক বা রাষ্ট্রনায়ক বেঁচে থাকেন তার সুকৃতি নির্মাণ ও ইতিবাচক অবদানের মধ্যে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির মতো একটি জনপ্রিয় দল প্রতিষ্ঠা করে তার স্বল্পকালীন শাসনকালে সেই ইতিবাচক অবদান যথেষ্টই রেখে গেছেন। জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের রাজনীতি। বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি, দারিদ্র্য মোচনের রাজনীতি। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে তিনি বুকটান করে দাঁড়িয়েছিলেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিশেষত ইসলামি মূল্যবোধকে মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়েছিলেন। এ দেশের মানুষ যে তার এই রাজনীতিকে গ্রহণ করেছিলেন, তার প্রমাণ শেখ হাসিনার ১৭ বছরে তাকে ভিলেন বানানোর অপচেষ্টা এবং ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যারপরনাই অপচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি এখনো পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক ও সমুজ্জ্বল।
বিএনপির বর্তমান কর্ণধার তারেক রহমান দেশ পরিচালনার পাশাপাশি দল পরিচালনার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার উদার অথচ দৃঢ় নীতি অনুসরণ করবেন; শৃঙ্খলার প্রশ্নে সুকঠিন হবেন; অনিয়ম-দুর্নীতি ও পেশিশক্তির আস্ফালন প্রশ্নে জিরো টলারেন্স দেখাবেন; উন্নয়ন, উৎপাদন ও জনগণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করবেন; অসৎ, ধান্ধাবাজ, সুবিধাবাদী এবং তোষামোদকারী চক্রে বন্দি হবেন না এসব আকাঙ্ক্ষা গণমানুষের। এমন আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে শতভাগ না হোক বহুলাংশে সফল হলেই তিনিও হয়ে উঠবেন বাবার মতো সফল রাষ্ট্রনায়ক।























