• আজ

যে বাবা-মা সারাজীবন সন্তানকে আগলে রাখেন, বার্ধক্যে তাঁদের কেন খুঁজতে হবে আশ্রয়?

বৃদ্ধাশ্রম নয়, বাবা-মায়ের শেষ আশ্রয় হোক সন্তানের ভালোবাসা

একটি প্রশ্ন প্রায়ই মনে জাগে: বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার ধারণাটি প্রথম কার মাথায় এসেছিল? সমাজে প্রবীণদের জন্য আলাদা আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয়ই কোনো বাস্তবতা থেকেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যদি এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত, যেখানে প্রত্যেক সন্তান বাবা-মায়ের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে কি অনেক বাবা-মায়ের বার্ধক্য আরও সুন্দর হতে পারত না?

আমি বৃদ্ধাশ্রমের বিরোধিতা করছি না: আমি প্রশ্ন তুলছি সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে, যে মানসিকতা কখনো কখনো জন্মদাতা বাবা-মাকে নিজের সংসারের বোঝা মনে করে। আমি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো বাবা-মাকে সন্তানের অবহেলা কিংবা অনাদরের কারণে নিজের পরিবার ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে না।

একবার ভাবুন, যে বাবা নিজের সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের স্বপ্নগুলোকে ত্যাগ করেছেন, সেই বাবাকে জীবনের শেষ বয়সে কেন একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করতে হবে?

যে মা নিজের মুখের খাবার তুলে দিয়েছেন সন্তানের মুখে, অসুস্থ শরীর নিয়েও সন্তানের পাশে থেকেছেন, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন, সেই মায়ের বার্ধক্যে কেন সন্তানের সংসারে জায়গার অভাব হবে?

সন্তান যখন ছোট ছিল, তখন বাবা-মা কখনো হিসাব করেননি, তাকে বড় করতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, কত রাতের ঘুম নষ্ট হচ্ছে, কত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। সন্তানের অসুস্থতায় তাঁরা ছুটে গেছেন চিকিৎসকের কাছে, সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়েছেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার আশায় নিজেদের বর্তমানকে করেছেন বিসর্জন।
কিন্তু সেই সন্তান যখন বড় হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায়, চাকরি করে, ব্যবসা করে, নিজের সংসার গড়ে, তখন কোনো কোনো পরিবারের চিত্র বদলে যায়। যে বাবা-মা একসময় ছিলেন সংসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাই কখনো কখনো হয়ে ওঠেন উপেক্ষিত।

বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার টাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাঁদের চিকিৎসার জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাঁদের কথা শোনার মতো মানুষ কমে যায়। কখনো তাঁদের প্রয়োজনকে বাড়তি দায়িত্ব মনে করা হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য পরিবারের ঘরে জায়গা থাকলেও হৃদয়ে জায়গা থাকে না।

কী নির্মম বাস্তবতা! যে সন্তানকে একদিন হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন বাবা, সেই বাবার চলার শক্তি কমে গেলে তাঁর হাত ধরার সময় কি সন্তানের থাকে না? যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, বয়সের ভারে সেই মায়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়াটাও কি একসময় দায়িত্বের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়?

অবশ্য সব সন্তান এক রকম নন: অনেক সন্তান আছেন, যাঁরা নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বাবা-মায়ের সেবা করেন, তাঁদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। আবার অনেক পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট, বাসস্থানের সীমাবদ্ধতা কিংবা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন থাকে। তাই বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানেই অবহেলার শিকার হওয়া নয়। অনেক প্রবীণ নিজের ইচ্ছায় প্রবীণ নিবাসে থাকতে চান, আবার কারও জন্য সেখানে থাকা নিরাপদ ও উপযুক্ত হতে পারে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, কোনো বাবা-মা যদি কেবল সন্তানের অনীহা, অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে সেই পরিস্থিতির দায় কে নেবে?

আমার মনে হয়, বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণের পাশাপাশি যদি এমন একটি আইন ও কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর আরও জোর দেওয়া হতো, যেখানে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা সন্তানের দায়িত্ব হিসেবে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে অনেক প্রবীণের জীবন আরও নিরাপদ হতে পারত।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ রয়েছে। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বের আইনগত ভিত্তি আমাদের দেশে আগে থেকেই আছে। এখন প্রয়োজন আইন সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা, যথাযথ প্রয়োগ এবং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বাবা-মাকে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে হবে না।

তবে শুধু আইন করলেই কি ভালোবাসা নিশ্চিত করা যায়? আইন কাউকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু সন্তানের হৃদয়ে বাবা-মায়ের প্রতি মমতা তৈরি করতে পারে না। সেই শিক্ষা দিতে হবে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ থেকে।

একটি বাড়িতে বাবা-মা ও সন্তান একসঙ্গে থাকলেই যে বাবা-মা সুখে আছেন, তা নয়। একই ছাদের নিচে থেকেও একজন বৃদ্ধ মানুষ নিঃসঙ্গ হতে পারেন। পরিবারের সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলার কেউ নেই। তাঁর খাবার আছে, ওষুধ আছে, থাকার ঘর আছে, কিন্তু মনের কথা শোনার মতো মানুষ নেই।

একজন বৃদ্ধ বাবার হয়তো দামি পোশাকের প্রয়োজন নেই। তিনি হয়তো শুধু চান, সন্তান দিনের শেষে তাঁর পাশে বসে কিছুক্ষণ কথা বলুক। একজন বৃদ্ধ মায়ের হয়তো বিলাসবহুল খাবারের প্রয়োজন নেই। তিনি হয়তো শুধু চান, সন্তান একবার জিজ্ঞেস করুক, “মা, তুমি কেমন আছ?”এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনেক বড় ভালোবাসা। এই সামান্য সময়টুকুই হয়তো একজন বৃদ্ধ মা-বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আমরা সন্তানদের জন্য বাড়ি বানাই, সম্পদ গড়ি, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেই সন্তানদের কি শেখাই, যাঁদের হাত ধরে তারা পৃথিবীতে এসেছে, তাঁদের প্রতি দায়িত্ব কী? সন্তানকে শুধু শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করলেই হবে না, তাকে মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।

আজ যে সন্তান বাবা-মায়ের ত্যাগের মূল্য বুঝতে শিখবে না, আগামী দিনে তার নিজের সন্তানও হয়তো দায়িত্ববোধের সেই শিক্ষা থেকে দূরে থাকবে। কারণ, শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, তারা পরিবারের মানুষের আচরণ দেখেও শেখে। বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও যত্নের চর্চা তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। সব প্রবীণের সন্তান নেই, সব সন্তান আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন, আবার সব পরিবারে প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয় না। তাই প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ আবাসন এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারে অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার প্রবীণদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালনের অর্থ সব পরিস্থিতিতে একই বাড়িতে বসবাস করতেই হবে, এমন নয়। কর্মসূত্রে দূরে থাকা কিংবা বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা যায়। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং আবেগগতভাবে পাশে থাকা সম্ভব। মূল কথা হলো, তাঁরা যেন কখনো নিজেদের পরিত্যক্ত বা অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য কোনো অপরাধ নয়, অসুস্থতা কোনো বোঝা নয়, আর বয়সের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া মানুষের মর্যাদা কমিয়ে দেয় না। আজ যাঁরা অন্যের অবলম্বন, কাল তাঁরাও কারও অবলম্বন হতে পারেন। সময়ের নিয়মে আমাদের সবার জীবনেই বার্ধক্য আসবে।

তখন আমরা আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করব?

হয়তো চাইব, তারা আমাদের একটু সময় দিক, আমাদের কথা শুনুক, অসুস্থ হলে পাশে থাকুক, আমাদের সম্মান করুক। তাহলে আজ আমাদের বাবা-মায়ের জন্য সেই সময়, যত্ন ও সম্মানটুকু দিতে দ্বিধা কেন?

আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম থাকবে প্রয়োজনের জন্য, কিন্তু কোনো বাবা-মাকে সন্তানের অবহেলার কারণে সেখানে যেতে বাধ্য হতে হবে না। যেখানে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ হবে সন্তানের দায়িত্ব, তাঁদের সম্মান হবে পরিবারের সংস্কৃতি এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

বৃদ্ধাশ্রম বন্ধ করে দেওয়াই সমাধান নয়:

সমাধান হলো এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রবীণ নিবাস হবে প্রয়োজনের নিরাপদ আশ্রয়, অবহেলার পরিণতি নয়। যেখানে সন্তানরা বাবা-মাকে বোঝা মনে করবেন না, আর বাবা-মায়েরাও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে পরিবারের অতিরিক্ত সদস্য ভাবতে বাধ্য হবেন না।

আমার প্রশ্ন তাই আজও একই:

বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণের পাশাপাশি যদি আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতাম, যেখানে বাবা-মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও সম্মান নিশ্চিত হতো, তাহলে কি আমাদের সমাজ আরও মানবিক হয়ে উঠত না?

বাবা-মা আমাদের জীবনের শিকড়: তাঁদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের অর্জন, আমাদের পরিচয়। সেই শিকড়কে অবহেলা করে কোনো সমাজ সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হতে পারে না।

বৃদ্ধাশ্রম থাকুক প্রয়োজনের জন্য, কিন্তু কোনো বাবা-মা যেন সন্তানের অবহেলার কারণে সেখানে যেতে বাধ্য না হন। তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি হোক নিরাপদ, সম্মানজনক ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। কারণ, বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্পদ নয়, সন্তানের আন্তরিকতা; সবচেয়ে বড় আশ্রয় শুধু একটি ঘর নয়, সন্তানের হৃদয়ে তাঁদের জন্য থাকা সম্মানের জায়গা।

লেখায় : নাজমা সুলতানা নীলা                                   সম্পাদক ও প্রকাশক                                               পিপলস নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম

পি নিউজ নীলা ফিচার