
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চার দিনব্যাপী (২২-২৬ জুন, ২০২৬) ঐতিহাসিক চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর। এই সফর কেবল দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী মৈত্রীকে পুনরুজ্জীবিত করেনি, বরং একবিংশ শতাব্দীর বহুমুখী বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে একটি গভীর, তাত্ত্বিক এবং সুদূরপ্রসারী ‘কৌশলগত সমবায় অংশীদারিত্বের’ (Comprehensive Strategic Cooperative Partnership) স্তরে উন্নীত করেছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক এবং অত্যন্ত সম্মানজনক ‘রেড কার্পেট’ অভ্যর্থনা প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব কতটা সুদৃঢ় ও অনস্বীকার্য।
প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা: ১৭টি চুক্তি ও দলীয় কূটনীতির গুরুত্বঃ
আন্তর্জাতিক রাজনীতির নব্য-বাস্তববাদী (Neo-realist) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রসমূহের বৈদেশিক নীতি মূলত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সমীকরণ দ্বারা চালিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মোট ১৭টি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং কাঠামোগত উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করবে।
স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর কৌশলগত বিন্যাস নিম্নরূপঃ
মন্ত্রণালয় পর্যায়ের চুক্তি (M2M):
মোট ১৭টি দলিলের মধ্যে ১৩টি স্বাক্ষরিত হয়েছে সরাসরি দুই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার মধ্যে, যা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের রূপরেখা:
৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্প-উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এটি দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করবে।
দলীয় স্তরের সংযোগ (Party-to-Party Diplomacy):
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং তাত্ত্বিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে রাজনৈতিক দলীয় পর্যায়ে—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিস্থিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে। এই ‘পার্টি-টু-পার্টি’ ডিপ্লোম্যাসি দুই দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক আস্থা ও স্ট্র্যাটেজিক বোঝাপড়াকে এক অনন্য উচ্চতা প্রদান করল।
অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের নবতর সমীকরণঃ
অর্থনৈতিক কূটনীতির পণ্ডিতবৃন্দ ও রাজনৈতিক সমাজ সমকালীন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভস’ (BRI) এবং ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভস’ (GDI)-এর প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জনাব তারেক রহমানের এই সফরে ডিজিটাল অর্থনীতি, গ্রিন এনার্জি বা সবুজ উন্নয়ন, ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স খাত, এবং তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়নের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপাদানের সংযুক্তি) মতো অত্যন্ত দূরদর্শী ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বেইজিংয়ের আলোচনায় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, চীনের শিল্প স্থানান্তর (Industrial Relocation) প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগানো এবং মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EPZ) বা ডেডিকেটেড শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আছ
মানবসম্পদ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ:
একই সাথে, বাংলাদেশ থেকে কৃষি পণ্য বিশেষ করে কাঁঠাল ও আম রপ্তানির কোয়ারেন্টাইন প্রোটোকল সই এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (TVET) উন্নয়নে পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের রাষ্ট্রীয় সংকল্পেরই প্রতিফলন। চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাথে বাংলাদেশের নতুন সরকারের “সবার আগে বাংলাদেশ” (Bangladesh Comes First) নীতির এক অপূর্ব অর্থনৈতিক সমন্বয় সাধন এই সফরের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি।
ভূ-রাজনীতি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত ভারসাম্যঃ
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত এবং ভূ-কৌশলগত দিকটি হলো বাংলাদেশের তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (TRCMPR) এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা। বেইজিং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছে যে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এবং নদী ব্যবস্থাপনায় চীন তার অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা এবং আর্থিক অনুদান দিয়ে পূর্ণ সহায়তা করবে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তিস্তা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগীদের যে প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ ছিল, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্যে তা পরিষ্কার হয়েছে:
“চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক এবং এটি তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তাই এটি যেকোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত।”
এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতির এক বিরাট কূটনৈতিক বিজয়।
তদুপরি, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ‘টু প্লাস টু’ (2+2) কৌশলগত সংলাপ মেকানিজম চালুর সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে, ঢাকা কেবল অর্থনৈতিক সাহায্য গ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার অন্যতম অংশীদার হিসেবে বেইজিংয়ের কাছে মূল্যায়িত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের বহুমাত্রিক মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার পুনরুল্লেখও বাংলাদেশের জাতীয় সুরক্ষায় অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ ও জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্যঃ
একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চিরায়ত সমীকরণ “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”—একে এক নতুন গতিশীল মাত্রা দিয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষে বেইজিংয়ে আগমন এবং গ্লোবাল সাউথের (Global South) নেতৃত্বের অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের অবস্থানকে তুলে ধরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক আবর্তে বা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না পড়ে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তাগিদ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এটি মূলত একটি সফল ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বা Balancing Act।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সেই অমোঘ উক্তি—”বিশ্বের পরিস্থিতি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে চীন সর্বদা বাংলাদেশের পাশে থাকবে” —আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত শক্তি জোগায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপির চার দিনের এই ঐতিহাসিক চীন সফর এবং স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতা স্মারক কেবল কাগজের দলিল নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং ভূ-রাজনৈতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার এক দূরদর্শী রূপরেখা। রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে গৃহীত এই কূটনৈতিক উদ্যোগ আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি (Key Player) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে—এ প্রত্যাশা আজ সর্বমহলে যৌক্তিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত।
লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।






















