=== console.log('header!'); // вставь сюда свой код полностью
  • আজ ১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উজানের সিদ্ধান্ত, ভাটির সংকট:

বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতিতে তিস্তার বাস্তবতা!

| Peoples News ৬:৪১ অপরাহ্ণ | ৩০/০৬/২০২৬ ফিচার

 

উজানে বাঁধের গেট খোলা বা বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়তো কয়েকশ কিলোমিটার দূরের কোনো প্রশাসনিক কক্ষে নেওয়া হয়, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় ভাটির কৃষকের শুকিয়ে যাওয়া জমিতে, জেলের খালি জালে এবং নদীপাড়ের মানুষের অনিশ্চিত জীবনে। তাই পানি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি এবং ন্যায্যতার প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে আনে বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতির প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতাকে?

তিস্তা হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী, যা ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। ১৯৭০-৮০ দশক থেকেই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭২ সালে দুই দেশ Joint Rivers Commission (JRC) গঠন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা সহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন ও তথ্য আদান-প্রদান। ১৯৮৩ সালে একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়, যেখানে তিস্তার পানি সাময়িকভাবে ভাগ করার প্রস্তাব ছিল (ভারত ৩৯%, বাংলাদেশ ৩৬%, বাকি প্রবাহ অব্যবহৃত রাখা হয়)। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছিল না। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরের সময় একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। সেই খসড়ায় শুষ্ক মৌসুমে ভারতের জন্য ৪২.৫ শতাংশ, বাংলাদেশের জন্য ৩৭.৫ শতাংশ এবং নদীর পরিবেশগত প্রয়োজনে ২০ শতাংশ পানি রাখার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। এভাবে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটি অমীমাংসিত কাঁটা হয়ে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ-ভারত পানি সহযোগিতা কি বাস্তব সমাধানের দিকে এগোচ্ছে, নাকি কেবল প্রতিশ্রুতির বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে?

তিস্তার মোট দৈর্ঘ্যের প্রায় ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে ‘হেলসিঙ্কি নীতি’ বা ‘জাতিসংঘ পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭’ অনুযায়ী, নদীর পানির ওপর প্রতিটি অববাহিকাভিত্তিক দেশের ন্যায্য ও যৌক্তিক অধিকার রয়েছে। বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত তার উজানের অংশে গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে তিস্তার পানিকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) যখন বাংলাদেশের বোরো চাষের জন্য পানির তীব্র প্রয়োজন হয়, তখন গজলডোবার সব কটি গেট বন্ধ করে পানি মহানন্দা খালের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরুভূমিতে পরিণত হয়। আবার বর্ষাকালে যখন ভারতে অতিরিক্ত পানি জমে, তখন গজলডোবার গেটগুলো একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে আকস্মিক বন্যা ও তীব্র নদীভাঙনের সৃষ্টি করে।

তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতাধীন। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ১০০-২০০ কিউসেকে নেমে আসায় লাখ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (IFPRI) এর মতে, পানির ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হারায়। ভবিষ্যতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সেচের জন্য নদীর পানি না পেয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। ফলে উত্তরবঙ্গে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণের লক্ষণ। কথায় আছে,

“নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন শুধু পানি শুকায় না; শুকিয়ে যায় একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর কোটি মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।”

বিকল্প সন্ধান: তিস্তা মহাপরিকল্পনা
ভারতের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বাংলাদেশ এখন নিজস্ব ও বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা। প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে তিস্তা নদীর গভীরতা বাড়ানো, নদীশাসন, দুই পাড়ে বাঁধ নির্মাণ এবং শুষ্ক মৌসুমের জন্য বিশাল জলাধার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। চীন এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। তবে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে (যেহেতু প্রকল্প এলাকাটি ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা চিকেনস নেকের কাছাকাছি) বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে একটি ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ভারতও পরবর্তীতে এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য প্রকল্পটির ভূ-রাজনীতির চেয়ে এর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং টেকসই সমাধান বেশি জরুরি।

টেকসই পানি কূটনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা,
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে ‘ডিপ্লোমেটিক গোল্ডেন চ্যাপ্টার’ বা সোনালী অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই সুসম্পর্কের সুফল অধরাই থেকে যাবে। এই মুহূর্তে দুই দেশের উচিত হবে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আস্থা পুনর্গঠন করা। এক্ষেত্রে,

১. ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।

২. বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফোরামে ‘লোয়ার রিপারিয়ান কান্ট্রি’ বা ভাটির দেশের অধিকার নিয়ে আরও জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে।

৩. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করার সদিচ্ছা বাড়াতে হবে।

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বাংলাদেশে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে, কারণ তিস্তা চুক্তির মূল বাধা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ক্ষমতার বাইরে।

এই মুহূর্তে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এর নবায়ন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, দুটি অভিন্ন নদীর প্রশ্নকে একসঙ্গে আলোচনার টেবিলে তোলার সুযোগ। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের শর্ত হিসেবে তিস্তা প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দাবি করা বাংলাদেশের জন্য একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক কৌশল হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, তিস্তা সংকট কেবল পানি বণ্টনের কোনো গাণিতিক হিসাব নয়। এটি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্ন। আর কালক্ষেপণ নয়, তিস্তার অববাহিকায় আবার প্রাণ ফিরে আসুক, এটাই আজ সময়ের দাবি।

 

লেখক : ইসরাত জাহান ইভা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

পি নিউজ/ তিস্তা উজান পানি