
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকার প্রধানের উদ্দেশে বলেছেন, এই কার্ডের খেলা না খেলে সত্যিকার অর্থে মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করুন।
তিনি বলেন, আপনি কার্ড দিচ্ছেন। এসব কার্ড সত্যিকার দুঃখ দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাবে কিনা, নাকি ছাত্রদল যুবদল বা বিভিন্ন আপনার লোকজনের কাছেই যাবে। এটা আপনি কিভাবে নিশ্চিত করবেন। কারণ অতীতেও আমরা দেখেছি সামাজিক নিরাপত্তার যেসব কর্মসূচি রয়েছে, যেসব সরকারি সুযোগ সুবিধা রয়েছে সেগুলো দলীয় লোকেরা পায়। গরিব মানুষ পায় না। প্রকৃত দুঃখ দুর্দশাগ্রস্তরা যেন কার্ড পায় প্রশাসনের তদারকিতে তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌরশহরের টেংগাপাড়া স্টেশন মাঠে ‘জুলাই পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মোহনগঞ্জ উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ পথসভার আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বছরের প্রায় ছয় মাস পানি এবং ছয় মাস শুকনো মৌসুম থাকে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই অনেক সময় মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে হাওরে কয়েক মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের ৩০ কেজি করে ধান দেওয়া হচ্ছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জেলে কার্ড’। কয়েক কেজি ধান দিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকা চলতে পারে না। সরকারের উচিত কার্ডনির্ভর সহায়তার পরিবর্তে প্রকৃত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
হাওরাঞ্চলকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল নিয়ে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে মৎস্যসম্পদ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়গুলো সংসদে উত্থাপনেরও আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনার পাশাপাশি দুর্নীতি ও লুটপাট কমাতে হবে।
চিফ হুইপ বলেন, যদি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না হয়। বিশেষ করে তরুণদের, প্রত্যেকের ঘরে যে তরুণ রয়েছে, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত এসব তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে এই দেশের অর্থনীতির কোন পরিবর্তন হবে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আমরা বলেছি বাংলাদেশ পরিবর্তনের বাংলাদেশ হবে, সংস্কার হবে। এই কারণে আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছি। সেই জুলাই সনদের ওপরে গণভোট হয়েছে। গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ এর পক্ষে রায় দিয়েছে। হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দেওয়া মানে আপনি জুলাই সদন বাস্তবায়ন করবেন, গণভোটে যে প্রশ্ন ছিল তা বাস্তবায়ন করবেন। পুলিশ সংস্কার হবে, আদালত সংস্কার হবে এবং সংবিধান সংস্কার হবে।
কিন্তু সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী তারা এখন সংস্কার হতে দিচ্ছেন না। তারা এখন গণভোটকে অস্বীকার করছে। ৭০ ভাগ জনগণের ভোটকে তারা অস্বীকার করছে। ফলে আমরা সারাদেশে মানুষের কাছে যাচ্ছি। আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে কথা বলুন যে, জুলাই সনদ সংস্কারটা যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে ১৪০০ মানুষ যে শহীদ হয়েছে, ৩০ হাজার মানুষ যারা আহত হয়েছে, বিএনপি কর্মী যারা জুলাইযোদ্ধা হিসেবে রাজপথে ছিল সকলের আত্মত্যাগ আমাদের বৃথা যাবে। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না। আমরা সেটা হতে দেব না।
তিনি বলেন, আমরা কোনো আন্দোলন করে পরিস্থিতি ঘোলা করতে চাই না। আমরা বলছি যে জনগণ আপনাদের ক্ষমতা দিয়েছে, ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতেও বলেছে। আপনারা সেই কাজটা করুন। আমরা যৌক্তিকভাবে সরকারের বিরোধিতা করব, আবার জাতির প্রয়োজনে সরকারকে সহায়তাও করব। কিন্তু সরকার যদি সংস্কার বাস্তবায়ন না করে, জুলাই সনদের সঙ্গে প্রতারণা করে, গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করে এই দেশের তরুণ প্রজন্ম, সাধারণ মানুষ এবং যারা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের পক্ষে এই সরকারকে সহযোগিতা করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরকে ভালো মানুষ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি যদি তার কৃতজ্ঞতাবোধ থাকে যদিও তিনি বলেছেন। তাহলে তিনি সংস্কারের পক্ষে কথা বলবেন এটা আমরা তার কাছে আশা করব। কারণ যারা জীবন দিয়ে তাকে জেলাখানা থেকে ছাড়িয়ে এনেছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি থেকে তিনি আজকে এমপি হয়েছেন। তিনি যদি প্রকৃতভাবে কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করতে চান তাহলে দেশের পরিবর্তনের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে, আওয়ামী লীগের বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জাতীয় সংসদের তিনি উচ্চকণ্ঠে সবার আগে কথা বলবেন।
পাশাপাশি নিজের দলকেও তিনি বোঝাবেন। তিনি যদি এটা করতে পারেন তাহলে আমরা গিয়ে তার পক্ষে দাঁড়াব। আর তিনি যদি সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে না পারেন তাহলে এই কৃতজ্ঞতাবোধ দিয়ে বাংলাদেশের কোন লাভ হবে না।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, যুগ্ম সদস্যসচিব খান তালাত মাহমুদ রাফি, জেলা এনসিপির সদস্যসচিব ও কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম খান পাঠানসহ দলীয় নেতারা।




















