
আজ ১৮ জুলাই। দুই বছর আগের এই দিনে রক্ত, আগুন আর নজিরবিহীন এক ডিজিটাল অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে এদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলা পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। একদিকে রাজপথে বুলেটের শব্দ ও আগুনের লেলিহান শিখা, অন্যদিকে রাতের গভীরে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ।
আজ ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই, সেই রক্তাক্ত ও মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায়ের দুই বছর পূর্ণ হলো।
রাজপথে রক্ত ও সংঘাত: উত্তরার ট্র্যাজেডি
১৮ জুলাই সকাল থেকেই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ সফল করতে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে শুরু হয় তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
উত্তরা আজমপুর: এই এলাকাটি সেদিন সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের মাঝে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল ও উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। শুধু উত্তরা থেকেই সেদিন অন্তত ৮ জনের মৃত্যুর খবর আসে।
মানবিকতার প্রতীক মুগ্ধ: উত্তরার সেই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন বিইউপি-র শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। “পানি লাগবে পানি?”—তার এই শেষ আকুতি থামিয়ে দিয়েছিল একটি নির্মম বুলেট। তার এই আত্মত্যাগ পরবর্তীতে আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
অন্যান্য এলাকায় প্রাণহানি: ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ এবং যাত্রাবাড়ীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন সাংবাদিক মেহেদি হাসান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্র মতে, শুধু এই একটি দিনেই অন্তত ২৭ থেকে ৩১ জন মানুষ প্রাণ হারান।
আগুনের গ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা।
মহাখালী ও বনানী: মহাখালীতে অবস্থিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানীর সেতু ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
মেট্রোরেল বন্ধ: মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার পর সেই ধোঁয়া মেট্রোরেলের লাইনে ছড়িয়ে পড়ে। জানমালের সুরক্ষায় দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেলের ৪টি স্টেশন।
বিটিভি ভবনে হামলা: বিকেলের দিকে রামপুরায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে সাময়িকভাবে চ্যানেলটির সম্প্রচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, অবরুদ্ধ এক বাংলাদেশ
১৮ জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন ধাক্কাটি আসে রাত ৯টার পর। আগের রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও, ১৮ জুলাই রাতে পুরো দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও সম্পূর্ণ ডাউন করে দেওয়া হয়। টানা ৫ দিন ব্রডব্যান্ড এবং ৮ দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ নামে পরিচিতি পায়।
শুরুতে মহাখালীর খাজা টাওয়ারের আগুনকে এর কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, পরবর্তীতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) নিশ্চিত করে যে, সরকারি নির্দেশেই মূলত এই সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ও বিটিআরসির ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
আলোচনা প্রত্যাখ্যান ও আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন
পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে তৎকালীন সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন এবং কোটা সংস্কারের আশ্বাস দেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’
দুই বছর আগের ১৮ জুলাইয়ের এই রক্তক্ষয়ী দিনটি শুধু সাধারণ মানুষের জীবনকেই থমকে দেয়নি, বরং এটি তৎকালীন সরকারের পতনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে এই ঘটনার পর ২০২৫ সালে দেশের টেলিযোগাযোগ আইনে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে হুট করে ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা সীমিত করা যায়। দুই বছর পরও ১৮ জুলাইয়ের সেই রক্ত, আগুন আর অন্ধকারের স্মৃতি প্রতিটি বাংলাদেশির মনে সমানে জাগ্রত।


















