
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একাধিক আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি শয়নকক্ষ থেকে সিসিটিভি ও মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ভিডিওগুলোতে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায় তাকে। এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সামাজিক ও গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়। গত সোমবার রাতে ভাইরাল হওয়া প্রথম ভিডিওকে দলীয় সমর্থকদের অনেকে এআই দিয়ে তৈরি করা দাবি করলেও পরে এমপি নিজেই তার ব্যাখ্যা দেন। তিনি আলোচিত মরিয়ম খাতুন নামে তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।
তবে জামায়াত এমপির বিয়ে ও ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ১৭ জুন বিয়ে করেছেন বলে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করলেও কোথায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে তা কাবিননামা নিবন্ধনকারী কাজী জানেন না। কাজী জানিয়েছেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে গত পরশু (সোমবার) দিবাগত রাতে। তার পরই ঢাকা থেকে ফোনে দেওয়া তথ্য দিয়ে তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেছেন।
কাবিননামার তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার ১২ নং গাবুরা ইউনিয়নের কাজী মাওলানা বি এ এম বাকী বিল্লাহর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টায় আমার দেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মোবাইল ফোনে (০১৯১১৩৩২৬…) স্বীকার করেন বিয়ে কবে, কোথায় হয়েছে তিনি জানেন না। তাকে সোমবার রাতে জানানো হয়েছে, ঢাকায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। নিবন্ধন তাকে করতে হবে।
ভাইরাল ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে আলাদা দুটি ভিডিওতে তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং তার পিতা মাসুম বিল্লাহ একই ধরনের বক্তব্য দেন। সেখানে বলা হয়েছে, পারিবারিকভাবেই তিন লাখ টাকা দেনমোহরে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এটা নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে জামায়াতের প্রবীণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এই এমপির এ ধরনের ভিডিও ভাইরালের ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরে চাপা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আরো খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ।
এদিকে গাজী নজরুলের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল এবং তা নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগের এক পর্যায়ে মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে একটি রুমে গাজী নজরুল ইসলাম এমপিকে তরুণীসহ অবরু্দ্ধ করে কয়েকজন ব্যক্তি। ওই ভিডিওতে এমপিকে উদ্দেশ করে লোকজনকে বলতে শোনা যায়— জামায়াত হয়ে এই কাজ কীভাবে করলেন? কদিন এনেছেন? অন্যায় করেছেন কিনা—ইত্যাদি। এ সময় গাজী নজরুল মাথা নেড়ে অন্যায় স্বীকার করে বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম’।
এ সময় মেয়েটির নাম জিজ্ঞাসা করা হলে অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে নাম মাহি বলে জানায়। তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি। বলেও যা, না বলেও তা। আপনারা এটা নিয়েই তো ঝামেলা করবেন।’
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের একটি কাবিননামাও ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, মেয়েটির জন্ম ২০০৮ সালের ২২ মে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানটি দ্য ডিসেন্ট মরিয়মের একটি বায়োডাটা সংগ্রহ করেছে, যেটিতে গাজী নজরুল ইসলাম এমপির গত ২২ জুন স্বাক্ষর করা সুপারিশ রয়েছে। বায়োডাটাটিতে এমপির স্বাক্ষরের উপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে, ‘জোর সুপারিশ করছি।’ বায়োডাটাটিতে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে।
১৭ জুন বিয়ে করে থাকলে ২২ জুন এমপি স্বাক্ষরিত মরিয়মের বায়োডাটাতে ‘অবিবাহিত’ লেখা হয়েছে কেন— এ বিষয়ে জানতে পরবর্তীতে গাজী নজরুলকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি বলে দ্য ডিসেন্ট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
কাজী যা বললেন
কাজী বাকীবিল্লাহ আমার দেশ-এর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমাকে সোমবার রাতে ফোনে সংসদ সদস্য ও মেয়েটির বিয়ের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিয়ের নিবন্ধন ১৭ তারিখ দেখানো হয়েছে। তার ভাষ্য, কনের বাবা সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সম্মতি দিয়েছেন এবং কনে ও অভিভাবক মঙ্গলবার সকালে এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন, বিয়ের তারিখ ১৭ তারিখ নির্ধারণ করে দিতে তাকে ফোনে জানানো হয়েছিল। মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টরা স্বাক্ষর করেন।
কাবিননামায় কনের নাম ও জন্ম তারিখের অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য তাকে ফোনে জানানো হয়েছিল। জন্ম তারিখও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী লিখেছেন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, কনের বয়স ১৮ বছর ৩ মাস ছিল।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ১৭ তারিখকে বিয়ের তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করতে তাকে ঢাকা থেকে ফোনে বলা হয়েছিল, আর স্বাক্ষর পরে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি একাধিকবার বক্তব্যে ভিন্নতা দেখান। শেষদিকে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা ভাই, আমি যাতে বিপদে পড়ে না যাই, আমাদের বিপদে ফেলেছেন। ঠিক আছে, ঠিক আছে’ বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা জামায়াতের
গাজী নজরুল ইসলামের ভিডিও ভাইরালের এক পর্যায়ে গতকাল বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে।
ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে।
এ বিষয়ে আরো খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য। তিনি ১৯৯১ এবং ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ফেসবুক পোস্টে গাজী নজরুলের ব্যাখ্যা
দেশবাসীকে উদ্দেশ করে গতকাল দুপুরে নিজের ফেসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম এমপি লিখেছেন, গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং আমার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী যথাক্রমে মোছা. মাকছুদা বেগম ও মোছা. মরিয়াম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক অফিসে যাই। সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি।
তিনি বলেন, আমরা ওই অফিসে অবস্থানকালে জোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে সে পাঁচ-সাতজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং আমাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করেন। আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এ সময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জেরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
গাজী নজরুল বলেন, পরবর্তীতে হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে—যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরো লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং আমার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগমের সঙ্গে তার বাবা মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই।
যারা আমাদের সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ভিডিওটি প্রকাশের পর দাবি করা হয়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা। পরে একই কক্ষের আরো ভিডিও সামনে এলে ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণীকে এমপির স্ত্রী দাবি করেছেন জামায়াতের স্থানীয় নেতারা। জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান ২১ জুলাই সকালে বলেন, ‘ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। ২০ জুলাই রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামকে একটি কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। ফুটেজের বিভিন্ন অংশে তাকে কখনো মোবাইল ফোনে কথা বলতে, আবার কখনো ওই নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি ঢাকার একটি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বলে তাদের ধারণা। তবে তার এই দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাজী নজরুল ইসলাম এমপির ভাইরাল ভিডিওতে যা আছে
গত সোমবার রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামকে একটি কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। ফুটেজের বিভিন্ন অংশে তাকে কখনো মোবাইল ফোনে কথা বলতে, আবার কখনো ওই নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ক্রাইম বার্তা’ কয়েকটি পোস্টে দাবি করে, এটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিও। তবে তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিডিওটিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার বা ডিজিটাল কারসাজির কোনো সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। তাদের মতে, এআই-নির্মিত ভিডিওতে সাধারণত যে ধরনের সীমাবদ্ধতা বা অসংগতি দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওতে তার কোনো স্পষ্ট উপস্থিতি নেই। প্রাথমিকভাবে এটিকে বাস্তব ভিডিও বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ভিডিওটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়টি দলীয়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তারিখ তার জানা নেই; তবে বেশ কিছুদিন আগে বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছে বলে তারা জেনেছেন।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগম পৃথক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণীর বয়স নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের হাতে আসা তার একটি বায়োডাটার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স প্রায় ১৮ বছর দুই মাস। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে ওই তরুণীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ওই বায়োডাটায় তিনি নিজেকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ২০২৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওটি বিভিন্ন মাধ্যমে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে দলীয় নেতাদের বক্তব্য, সংসদ সদস্যের লিখিত ব্যাখ্যা এবং তার দুই স্ত্রীর ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। তবে ভিডিও ধারণ, প্রকাশ এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ফ্যাক্ট চেক: জামায়াত এমপির ব্যক্তিগত মুহূর্তের লিকড ফুটেজটি ২০২৩ সালের নয়, ২০২৬-এর নির্বাচনের পরের
গতকাল মঙ্গলবার ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্টের’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-‘গতকাল (২০ জুলাই) রাতে ফেসবুকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে একাধিক ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়লে এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলাম এমপির ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি বাস্তব, এআই দিয়ে তৈরি নয়। তবে আলোচ্য ভিডিওটি ধারণের সময় ও স্থান সম্পর্কে তখন জানাতে পারেনি।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির টাইমস্টাম্পে ২০২৩ সাল লেখা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরে ধারণ করা।
দ্য ডিসেন্টকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, তার সঙ্গে থাকা ঐ নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। গত ১৭ জুন, ২০২৬ এ তিনি ঐ তরুণীকে বিয়ে করেন। এক ফেসবুক পোস্টেও তিনি একই তথ্য জানান।
এছাড়াও, গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং তার বাবা মাসুম বিল্লাহও ১৭ জুন দ্বিতীয় বিয়ের কথা স্বীকার করেছেন।
দ্য ডিসেন্ট বিয়ের একটি কাবিননামা সংগ্রহ করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, উল্লিখিত তারিখে বিয়ে নিবন্ধনের তথ্য উল্লেখ করা আছে। কাবিননামা এবং মেয়ের একটি বায়োডাটাতে জন্ম তারিখ ২০০৮ সালের ২২ মে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি চলতি বছরের গত ১৩ জুলাইয়ের তোলা। নজরুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছে যে, সর্বপ্রথম ফাঁস হওয়া ভিডিও ফুটেজটি ২০২৩ সালের নয় বরং ২০২৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পরে। তবে ভিডিওটি নির্দিষ্টভাবে ১৩ জুলাই তারিখে তোলা কি না তা নিশ্চিত করতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট।
নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ফুটেজটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভিডিওতে গাজী নজরুল ইসলামের গাড়িতে সংসদ সদস্য কার্ড দেখা যায়; যা থেকে বোঝা যায় এই ভিডিওটি গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পরের, ২০২৩ সালের নয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় দুইটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, দুটি ভিডিওতেই এমপি নজরুল ইসলাম এবং সঙ্গে থাকা নারী উভয়ের পোশাক, বিছানার চাদর, বালিশ ও ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থান ইত্যাদিতে হুবহু মিল রয়েছে অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় দুটি ভিডিওই একই সময়ের এবং একই কক্ষে তোলা।
প্রথম ফুটেজের ক্যামেরা আপডেটেড না থাকায় অথবা সম্পাদনার ফলে ধারণের সময় ২০২৩ দেখিয়ে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক ব্যক্তি প্রথম ভিডিওতে দেখা যাওয়া রুমে প্রবেশ করে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং মরিয়ম খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ভিডিওতে একাধিক লোককে বলতে শোনা যায়, “দেখেন সাতক্ষীরা জামাতের লোক মেয়েসহ এখানে ধরা খাইছে… আপনার বাসা হইলো মিরপুর (নারীকে উদ্দেশ করে বলেছে) —আপনি চাকরি দেওয়ার কথা বলে আনছেন না? (জামায়াতের এমপিকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন।)”
এ সময় জামায়াতের এমপি ভিডিওতে দৃশ্যমান তরুণীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলেন যে,‘আমার আত্মীয়।’ এরপর একাধিক ব্যক্তি ঐ নারীকে জিজ্ঞাসা করেছেন তাকে চাকরির কথা বলে এখানে আনা হয়েছে কি না?
বারবার প্রশ্ন করা হলেও ঐ নারী কোনো উত্তর দেননি।
ভিডিওর শেষে এমপিকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ঐ নারীকে আনার ব্যাপারে বারবার জিজ্ঞেস করা হলে তাকে বলতে শোনা যায়, “ওর আব্বা বলছিলো চাকরি দেওয়া যায় ”।
নিজের ফেসবুক আইডিতে আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসেও রুমে অবস্থানকালে কিছু ব্যক্তি তার রুমে ঢুকে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি সেখানে লিখেছিলেন, ‘পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লাখ টাকা আদায় করে। আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।’
সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
সাতক্ষীরার-৪ আসনের জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
উম্মে সালমা নামের আইডিতে ‘ভাইরাল ঘটনায় আমার কিছু কথা আছে’ মর্মে বলা হয়েছে-বাচ্চা মেয়েটি তার স্ত্রী, প্রেমিকা বা অন্য কোনো সম্পর্কের মানুষ এটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু যখন একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ব্যক্তি এ ধরনের বিতর্কে জড়ান, তখন বিষয়টি আর কেবল ব্যক্তিগত থাকে না। তখন এটি জনস্বার্থ, নৈতিকতা, রাজনৈতিক জবাবদিহি ও আইনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিকখবর
তিনি লিখেছেন- চাকরির সুপারিশের বিষয়টি ব্যাখ্যা প্রয়োজন; মেয়েটির বয়স নিয়েও স্পষ্টতা দরকার; রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে আরো বেশি হতাশাজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ছাত্রী সংস্থার প্রতিবাদ বিবৃতি
গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনায় ছাত্রী সংস্থাকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কেন্দ্রীয় সভানেত্রী মুনজিয়া ও সেক্রেটারি জেনারেল ডা. নাহিয়ান ফাইরুজ এক বিবৃতিতে এ দাবি করেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা এ মিথ্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সাতক্ষীরার এ ঘটনায় জড়িত মোছা. মরিয়ম বেগম (পিতা মো. মাসুম বিল্লাহ) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে জড়িত নন।’
তারা আরো বলেন, পবিত্র কোরআনে সুরা হুজরাতের ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘হে ইমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোনো গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ সবাইকে যাচাইবিহীন এমন তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ করা হলো।



















