
নৈতিক স্খলনের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়াতে আলটিমেটাম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সূত্র জানায়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আইনি জটিলতা এড়াতে নজরুল ইসলামকে প্রথমে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় তার এমপি পদ বাতিলে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে আইনি চিঠি পাঠানো হবে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানা গেছে, জামায়াতের সংসদীয় দলের কেউ গাজী নজরুলের পক্ষে নেই। সবার চাওয়া ছিল, তাকে বহিষ্কার করা হোক। না হলে সংসদের অধিবেশনে সরকারি দল বিএনপি গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সামনে এনে জামায়াতকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতো। তাই তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের ব্যাপারে দলের সব সংসদ সদস্য মতামত দেন। গাজী নজরুল যদি নিজ থেকে পদত্যাগ না করে এখন আইনি লড়াই চালিয়ে যান, তাহলে হয়তো তিনি কয়েক মাস বা বছরখানেক এমপি পদে থাকতে পারেন। তবে সংসদে নজরুল ইসলাম জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে বসতে পারবেন না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে জানান, গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন হয়েছে, তাই তাকে বহিষ্কার করেছি। গাজী নজরুল এখন আর জামায়াতের কেউ নন। ফলে তিনি জামায়াতের এমপি নন। তাই তার বিষয়ে যেসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে সবই নেওয়া হবে। দলীয়ভাবে দুই-একদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে তার বহিষ্কারের বিষয়টি অবহিত করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে নজরুল ইসলামকে স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে বলা হয়েছে। তিনি নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে তার এমপি পদ বাতিলে সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হবে শিগগির। হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, আমরা কারও চেহারা দেখে নয়, তার নৈতিক স্খলন দেখে সিদ্ধান্ত নিই। ভবিষ্যতেও দলের আদর্শের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
জামায়াতের সূত্র জানায়, গাজী নজরুলকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বলা হলেও তিনি এখনো দলকে কিছুই জানাননি। আবার পদত্যাগ করবেন না, এমন কিছুও বলেননি। এবিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্যে নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক বার ফোন দিলেও, তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল তাকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়। এ কারণে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের বিষয়টি জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনকে জানানো পর পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য বাতিল হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে সংবিধান ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে।
গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিমালা সংশোধন কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালবেলাকে বলেন, স্পিকার এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলে আমরা তা বিচার বিশ্লেষণ করে পরে সিদ্ধান্ত নেব।
এ বিষয়ে কথা হলে নির্বাচন কমিশনের সাবেক যুগ্ম সচিব (আইন) ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. মো. শাহজাহান কালবেলাকে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ যাওয়ার জন্য দুটি বিষয় বলা আছে। একটি হলো ফ্লোর ক্রসিং- মানে তিনি যে রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে। এ ভোট হচ্ছে আস্থা ভোট। আরেকটি হলো যদি তিনি নিজে সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন। তাই শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্যপদ যাবে না।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু তিনি একটি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন দল যেহেতু তাকে বহিষ্কার করেছে, আবার সে তো স্বতন্ত্র নির্বাচন করে নাই। সে তো নির্বাচন করেছে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে। তাই তার সদস্যপদ থাকবে কীভাবে? এইটা একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হবে। কারণ হচ্ছে সে সংসদে কোন দলের প্রতিনিধিত্ব করবে? স্বতন্ত্র নাকি দল? দল থেকে বহিষ্কার করলে সে ওই দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না। তাই তার সংসদ সদস্যপদ থাকা উচিত নয়।
ড. মো. শাহজাহান বলেন, আর একটা ব্যাপার হলো, সে নিজে পদত্যাগ করে চলে গেলে ভালো। জনগণ তাকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ভোট দিয়েছে। স্বতন্ত্র হিসেবে নয়। সে শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়, দলকে রিপ্রেজেন্ট করেছে। এক্ষেত্রে নীতিগতভাবে তার পদত্যাগ করা উচিত এই কারণে, যেহেতু জনগণ কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেয়নি। জনগণ একটা রাজনৈতিক মতাদর্শধারী ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। সেই দলই তাকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। তাহলে ওই দলের সমর্থিত জনগণ যারা তাকে ভোট দিয়েছে, এতে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার হয়ে যাচ্ছে। কারণ যে দল মনোনয়ন দিয়েছে সেই দল থেকে বহিষ্কারই করে দিচ্ছে। বহিষ্কার করে দিলে দলকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারছে না পার্লামেন্টে। কাজেই সেই প্রশ্নে নীতিগতভাবে তার পদত্যাগ করা উচিত। তবে এখানে সাংবিধানিক বিধি কার্যকর থাকবে বলে জানান তিনি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে যদি তিনি যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন বা ভোটদান থেকে বিরত থাকেন (দলের নির্দেশ অমান্য করে)। তবে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি দল তাকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে, তা সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা নেই। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির লেখেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ নৈতিক স্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে তাকে হয় কোনো দলের মনোনীত প্রার্থী হতে হয় অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হয়। দলীয় প্রার্থীরা সংসদে দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার কথা বলা আছে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এবং জাতীয় নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও)। এখানে যেসব অযোগ্যতার কথা বলা আছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও কারও সে অযোগ্যতা তৈরি হলে তিনি পদ হারাতে পারেন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ সদস্য অযোগ্য হবেন তার একটি হলো নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে। ফলে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দৃশ্যত সংসদ সদস্য থাকার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা প্রমাণ করে না।
দল থেকে বহিষ্কার
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে জানানো হয়, বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, আমরা কারও চেহারা দেখে নয়, তার নৈতিক স্খলন দেখে সিদ্ধান্ত নিই। ভবিষ্যতেও দলের আদর্শের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম নৈতিক স্খলন করেছেন, তাই তাকে বহিষ্কার করেছি। এখন তার পদও থাকবে না। দলীয়ভাবে দুই-একদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে তার বহিষ্কারের বিষয়টি অবহিত করা হবে।
এদিকে, দল থেকে বহিষ্কারের পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বাদী নজরুল ইসলামের ড্রাইভার ওবায়দুর রহমানের চাচাতো ভাই।
বহিষ্কারের পরও এমপি থাকার নজির আছে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার নজির রয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু হেনা। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। সেই সময়ে আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার। এরপর দশম সংসদে ২০১৪ সালে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে সংসদ সদস্য থাকাকালে বহিষ্কার করেছিল আওয়ামী লীগ। তখন বিতর্ক তৈরি হলেও তার সুরাহা হয়নি। দল থেকে বহিষ্কারের পর সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়েছিলেন স্পিকার। পরে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও লতিফ সিদ্দিকীর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী সময়ে সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। এরপর ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন।


















