• আজ ১৪ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফেসবুক পোস্টে পাটওয়ারী

মসজিদ-মাদ্রাসার ভেতরে গিয়ে কাউকে উসকানি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়

| নিউজ রুম এডিটর ৪:০৬ অপরাহ্ণ | ২৯/০৮/২০২৬ জাতীয়

মসজিদ ও মাদ্রাসার ভেতরে গিয়ে কাউকে উসকানি দেওয়া, ধর্মীয় মানুষকে অপমান করা কিংবা তাদের বিশ্বাসকে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

 

শনিবার (২৯ আগস্ট) ফেসবুকে করা এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।

 

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর করা ওই পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

 

‘ওলামায়ে দেওবন্দ, বাংলার মাটিতে তাদের শিকড়

 

ওলামায়ে দেওবন্দের ধারাকে বাংলার রাজনীতি, সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির বাইরে রেখে বাংলাদেশকে বোঝা কঠিন। এটি কোনো হঠাৎ ভেসে আসা ধারা নয়, কোনো একদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে তৈরি কোনো শক্তিও নয়। এর শিকড় উপমহাদেশের দীর্ঘ ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজসংস্কার, ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলন এবং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় রক্ষার ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

 

দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৬ সালে। পরবর্তী সময়ে এর শিক্ষাব্যবস্থা ও চিন্তার ধারা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য মাদ্রাসা ও আলেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার বহু আলেম দেওবন্দে শিক্ষা গ্রহণ করে ফিরে এসে স্থানীয়ভাবে মাদ্রাসা, মসজিদ, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দেওবন্দে শিক্ষিত আলেমরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মুসলিম সমাজ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এই ইতিহাস শুধু রাজনীতির ইতিহাস নয়, এটি শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান, সমাজসংস্কার, দাওয়াহ এবং স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বের ইতিহাসও।

 

আজকের বাংলাদেশে মসজিদ-মাদ্রাসা, ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মীয় শিক্ষা এবং গ্রামীণ সমাজের নৈতিক কাঠামোর সাথে এই ধারার সম্পর্ক গভীর। কোটি মানুষের ধর্মীয় জীবনের সাথে যুক্ত এই সামাজিক বাস্তবতাকে শুধু রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের চশমা দিয়ে দেখলে বাংলাদেশের সমাজকে বোঝা যাবে না।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মসজিদ ও মাদ্রাসার ভেতরে গিয়ে কাউকে উসকানি দেওয়া, ধর্মীয় মানুষকে অপমান করা কিংবা তাদের বিশ্বাসকে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র, শ্রমিক, সবারই মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সংগঠনের অধিকার থাকতে হবে। একই সাথে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য হতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কর্মসূচি দমন করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা মানুষের ওপর হামলাও গ্রহণযোগ্য নয়।

 

জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানও আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশের কোনো বৃহৎ সামাজিক শক্তিকে বাদ দিয়ে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় হেফাজত, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থী সামাজিক নেটওয়ার্কের জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে।

 

তাই তাদের অবদানকে অস্বীকার করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি জুলাইয়ের পুরো গণঅভ্যুত্থানকে একক কোনো সংগঠনের অর্জন হিসেবে দেখাও ইতিহাসকে সংকুচিত করা।

 

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি। এখানে আলেম থাকবেন, মুক্তচিন্তার মানুষ থাকবেন, বামপন্থী থাকবেন, জাতীয়তাবাদী থাকবেন, ইসলামপন্থী থাকবেন, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি থাকবেন, কিন্তু কারও নাগরিক অধিকার অন্যের চেয়ে কম হবে না।

 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কাউকে খামচি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবাইকে একই রাজনৈতিক মাঠে নিয়ে আসা।

 

ওলামায়ে দেওবন্দের ধারার মানুষগুলো এই বাংলার সমাজে বহুদিন ধরে আছেন। মসজিদের মিম্বরে, মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে, গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে এবং মানুষের ধর্মীয়-নৈতিক জীবনে তাদের উপস্থিতি বাস্তব। তাদের সাথে মতপার্থক্য থাকতে পারে, রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে, তাদের কোনো কোনো কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও অবশ্যই করা যাবে।

 

কিন্তু মতপার্থক্য মানেই মুছে ফেলা নয়। বাংলার মাটিতে যাদের বহু প্রজন্মের সামাজিক শিকড়, তাদের সাথে সংঘাত নয়, প্রয়োজন সংলাপ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সম্মান এবং আইনের সমান প্রয়োগ।

 

তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক অবদান, ধর্মীয় শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে রাষ্ট্রের আরও গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন। একই সাথে তাদের কাছ থেকেও প্রয়োজন দায়িত্বশীল, শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের অঙ্গীকার।

 

 

আওয়ামী লীগ একটা পচন ধরা দল: সোহেল তাজ

বাংলাদেশ কারও একার নয়। এই দেশ আলেমেরও, শ্রমিকেরও; কৃষকেরও, ছাত্রেরও; মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরও, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরও।

 

যে বাংলাদেশে কাউকে তার বিশ্বাসের জন্য খামচি দিয়ে সরিয়ে দিতে হবে না, আবার বিশ্বাসের নামে কাউকে ভয়ও দেখানো হবে না, সেই বাংলাদেশই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

 

সংঘাত নয়—সহাবস্থান। উসকানি নয়—সংলাপ।

 

দমন নয়—গণতন্ত্র। বৈষম্য নয়—সমান নাগরিক অধিকার। এটাই নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হওয়া উচিত।’