• আজ ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

| নিউজ রুম এডিটর ১১:১০ পূর্বাহ্ণ | ০২/০৮/২০২৬ অপরাধ-দুর্নীতি

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বাকডোকরা খাল খনন প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দায়সারা খনন, কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর নিয়ম থাকলেও এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটাসহ প্রকল্পজুড়ে অনিয়মের সত্যতা মিলেছে। বিশেষ করে একটি গাছের পেছনে ৬৭৯ টাকা এবং বাজারমূল্য দুই হাজার টাকার আরসিসি রিং পাইপের দাম ১৩ হাজার ৪৭৯ টাকা দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি কালভার্ট নির্মাণ ব্যয় ৯ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১৬ লাখ টাকা করা এবং প্রকল্প কমিটির স্বাক্ষর ছাড়াই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন আটোয়ারী প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন এই খাল খননের উদ্যোগ নেয়। চলতি বছরের ৮ মে বাকডোকরা কুলাডাঙ্গী পুল হতে পশ্চিমে আব্বাস আলীর জমি পর্যন্ত ৬০৫ মিটার খাল খননের উদ্বোধন করা হয়। দুটি কালভার্ট নির্মাণ, পাইপ স্থাপন ও বৃক্ষরোপণসহ প্রকল্পটিতে মোট ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তথ্য মতে, শ্রমিকদের মাধ্যমে খননে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা, এক্সকাভেটর দিয়ে খননে ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আরসিসি পাইপ স্থাপনে ৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কালভার্ট নির্মাণে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা, ঘাস লাগানোয় ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা এবং গাছ রোপণের জন্য ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের দুটি কালভার্টের বরাদ্দ পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা করা হয়।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১ হাজার ১৫৪টি বৃক্ষ রোপণের কথা থাকলেও বাস্তবে রোপণ করা হয়েছে মাত্র ৬৮০টি, যেখানে প্রতিটি গাছে গড়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৭৯ টাকা। অন্যদিকে ১৯৬টি আরসিসি রিং পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও ২২টি স্থানে স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ৪৮টি। এসব রিং পাইপের প্রতিটির বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা হলেও ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭৯ টাকা। ১১৯ জন শ্রমিককে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে হাজিরা দেওয়ার পরও ঘাস লাগানো খাতে বাড়তি ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া খালের পারাপারে ৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২ মিটার প্রস্থের দুটি কালভার্ট নির্মাণে প্রথমে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা করা হয়। একই সঙ্গে কালভার্ট নির্মাণে ১৬ মিলি রডের পরিবর্তে ১২ মিলি রড এবং মাটি ও আবর্জনা মিশ্রিত নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই স্থানে আগে কোনো খাল না থাকলেও নকশায় খাল দেখানো হয়েছে। এমনকি খাল খননের বেশিরভাগ কাজ শ্রমিকদের দিয়ে করানোর কথা থাকলেও শুরুতেই এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে বেশিরভাগ কাজ শেষ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, এই খাল খননের শুরু থেকেই অনিয়ম হয়ে আসছে, ঠিকমতো কাজ হয়নি। কালভার্টের কাজ হচ্ছে ইটের গুঁড়ো দিয়ে। এভাবে কাজ হওয়ায় কিছু মানুষের পকেটে টাকা ঢুকলেও সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। কাজল নামের আরেক বাসিন্দা জানান, এসএ খতিয়ানে সেখানে কোনো খাল ছিল না, বর্তমানে আরএস খতিয়ানে খাল দেখানো হয়েছে এবং এই খাল খনন করায় ৯০ শতাংশ মানুষের ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পে ৭ সদস্যের একটি কমিটি রাখা হলেও তাদের দাবি—প্রকল্পের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমর্থক। এমনকি প্রকল্পের টাকা উত্তোলনে তাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। প্রকল্প কমিটির সদস্য ময়না বেগম বলেন, আমাকে না জানিয়ে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কাজ করার কথা ছিল শ্রমিক দিয়ে, কিন্তু কাজ করা হচ্ছে ভেকু দিয়ে। প্রকল্পের সভাপতি ও আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য করুনা রানী পাল বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় বাইরে আছি। যেখানে সই লেগেছে, আমি সই করে দিয়েছি। বাকি সবকিছু চেয়ারম্যান করছেন। কোথায় কী কাজ হয়েছে, আমি কিছুই জানি না।

আটোয়ারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করছিলাম। কালভার্ট নির্মাণে এক ট্রলি নিম্নমানের ইটের খোয়া আনা হয়েছিল, সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের কাজ শেষ হয়েছে এবং তারা পেমেন্ট পেয়ে গেছে। তদন্তের কারণে বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামণি দেবী বলেন, অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমরা কাজ বন্ধ রেখে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি এবং উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সালকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।