• আজ ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তথ্য ফাঁস

| নিউজ রুম এডিটর ৮:০৩ অপরাহ্ণ | ১৬/০৭/২০২৬ সারাদেশ

ভারতের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তামিলনাড়ুর ‘কুদানকুলাম’-এর বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল ফাইল ডার্ক ওয়েবে ফাঁস করে দিয়েছে কুখ্যাত র‍্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’। ফাঁস হওয়া ফাইলের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশের নকশা (ব্লু-প্রিন্ট) এবং সরবরাহকারীদের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে, যা ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী অনিল আম্বানির শিল্পগোষ্ঠী ‘রিলায়েন্স গ্রুপ’ থেকে হ্যাক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে হ্যাকাররা।

ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অন্যতম ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স গ্রুপ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, থার্ড পার্টি ভারতীয় ডেটা সেন্টার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ‘ইয়োটা’-র সার্ভারে থাকা তাদের ডেটায় আংশিক হ্যাকের ঘটনা ঘটেছে এবং বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের তথ্য বেহাত হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি রিলায়েন্স।

এদিকে পরমাণু নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ’-এর ঊর্ধ্বতন পরিচালক নিকোলাস রথ সতর্ক করে বলেছেন, এই ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনাটি পারমাণবিক কেন্দ্রটির নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো প্রতিপক্ষ কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ থাকা ব্যক্তিদেরই চিহ্নিত করবে না, বরং এর মাধ্যমে কোন কোন সিস্টেমে পৌঁছানো সম্ভব, তাও জেনে যেতে পারে।

স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা গবেষক রাকেশ কৃষ্ণান প্রথম এই তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সামনে আনেন। তার তথ্যমতে, গত ১১ জুন থেকে ইন্টারনেট দুনিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সংক্ষিপ্ত রূপ ‘কেকেএনপি’ (KKNP) সার্চ টার্মের অধীনে প্রায় ১৯ হাজার ফাইল উন্মুক্ত রয়েছে, যার মোট আকার ১৪.৩ গিগাবাইট।

রয়টার্স ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তৈরি হওয়া এই নথিগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছে। সেখানে নকশা ও সরবরাহকারীর তথ্যের পাশাপাশি মিটিং ও পরিদর্শনের রেকর্ড, সরঞ্জামের পর্যালোচনা এবং বীমা পলিসির নথিপত্র রয়েছে।

হ্যাকারদের ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ ওয়েবসাইটে থাকা রিলায়েন্সের মোট ৮ লাখ ৫৮ হাজার ফাইলের মধ্যে এই ১৯ হাজার ফাইলকে সবচেয়ে সংবেদনশীল মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ২০১৮ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের নকশা ও নির্মাণের কাজ পেয়েছিল। ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই ইউনিট দুটি ২০২৭ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

সাধারণত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য চুরি করে মুক্তিপণ দাবি করা এবং তা না পেলে ডার্ক ওয়েবে ফাঁস করা ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’-এর পুরোনো অভ্যাস। এর আগে তারা নাইকি এবং ভারতের টাটা গ্রুপের সার্ভারেও হামলা চালিয়েছিল। গত জুনে টাটা গ্রুপের ফাইলের জন্য ১৫ লাখ ডলার মুক্তিপণ চেয়েছিল তারা, যেখানে অ্যাপল ও টেসলার গোপন যন্ত্রাংশের নকশা ছিল। টাটা গ্রুপ দাবি পূরণ না করায় তারা তথ্যগুলো ফাঁস করে দেয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ভারতের প্রধান সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ (সার্ট-ইন) এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন যৌথভাবে এই সাইবার হানার ঘটনা তদন্ত করছে।

ডেটা হোস্টকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইয়োটা’ জানিয়েছে, গত ২৯ মে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মালিকানাধীন একটি সার্ভারে তারা সন্দেহজনক কার্যকলাপ লক্ষ্য করে এবং তা প্রতিরোধ করে। তবে জুনের শেষদিকে রিলায়েন্স তাদের জানায় যে বাইরের একটি পক্ষ তথ্য চুরির দাবি করেছে। এ বিষয়ে ভারতের আনবিক শক্তি বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে পারমাণবিক চুল্লির মূল বা ‘কোর’ সিস্টেমের (যা রাশিয়ার রোসাটম সরবরাহ করে) কোনো সম্পর্ক নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নির্মাণাধীন ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের ভেন্টিলেশন ও কুলিং ব্যবস্থার নকশা এবং কমন কন্ট্রোল রুমের ফ্লোর লেআউট এতে রয়েছে। এছাড়া একটি নথিতে দেখা যায়, ৩ বা ৪ নম্বর ইউনিটে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে রিলায়েন্স ও নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন বীমা বাবদ ১১২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাবে।

গবেষকদের মতে, এই তথ্যগুলো হাতে পেলে দুষ্কৃতকারীরা সহজেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে পারবে। বিশ্বে তথ্য ফাঁসের তালিকায় ভারতের অবস্থান এখন তৃতীয়। গত বছর দেশটিতে ২ কোটি ৮৯ লাখ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের চেয়ে কম।

এর আগে ২০১৯ সালেও কুদানকুলাম পারমাণবিক কেন্দ্রে ম্যালওয়্যার হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সাম্প্রতিক এই বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকেই আবার সামনে এনে দিল।