
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ: বাংলাদেশ—এই একটি নামেই যেন হাজার বছরের ইতিহাস, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার সমাহার। এই দেশ আমার পরিচয়, আমার ভাষা, আমার আবেগ। সবার আগে বাংলাদেশ—এটি কোনো স্লোগানমাত্র নয়; এটি একটি চেতনা, একটি নৈতিক অবস্থান, একটি অঙ্গীকার। ব্যক্তি, দল, মত, স্বার্থ—সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দৃঢ় সংকল্পই এর মূল কথা।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে। ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার সাহস, স্বাধীনতার জন্য বুক পেতে দেওয়ার অদম্য শক্তি—এই জাতিকে গড়ে তুলেছে সংগ্রামের আগুনে পুড়ে। সেই ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, দেশ কেবল মানচিত্রের একটি ভূখণ্ড নয়; দেশ হলো মানুষের আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, ঘাম-শ্রম আর স্বপ্নের ঠিকানা। তাই যখন আমরা বলি “সবার আগে বাংলাদেশ”, তখন আমরা আসলে সেই মানুষের কথাই বলি—যাদের শ্রমে দেশ চলে, যাদের বিশ্বাসে দেশ বাঁচে।
এই দেশের মাটি উর্বর, নদী প্রাণবন্ত, আকাশ উদার। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। কৃষকের ঘামে ধান ফলে, শ্রমিকের হাতে শহর দাঁড়ায়, শিক্ষকের আলোয় ভবিষ্যৎ গড়ে, চিকিৎসকের মমতায় প্রাণ ফিরে পায়। প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করলে দেশ এগোয়। দেশপ্রেম এখানে বড় বড় কথায় নয়; সততা, দায়িত্ববোধ আর মানবিক আচরণেই তার প্রকাশ। রাস্তার শৃঙ্খলা মানা, কর দেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান করা—এসব ছোট ছোট কাজই বড় দেশপ্রেম।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকালে দেখি, আমাদের অর্জন আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে। উন্নয়ন এসেছে, অবকাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন সহজ হয়েছে। আবার একই সঙ্গে বৈষম্য, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা—এই চ্যালেঞ্জগুলোও বাস্তব। সবার আগে বাংলাদেশ মানে এই নয় যে আমরা চোখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নেব। বরং সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে, ভুলকে সংশোধন করে, ভালোকে এগিয়ে নেওয়াই প্রকৃত দেশপ্রেম।
ভাষা আমাদের আত্মার সেতু। এই ভাষায় আমরা হাসি, কাঁদি, স্বপ্ন দেখি। সংস্কৃতি আমাদের শিকড়—গান, কবিতা, নাটক, উৎসব আমাদের একসূত্রে বেঁধে রাখে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভিন্নতা সত্ত্বেও সহাবস্থানই এই দেশের শক্তি। সবার আগে বাংলাদেশ মানে বিভাজনের রাজনীতি নয়; ঐক্যের চর্চা। ভিন্নমত থাকবে, থাকবে বিতর্ক—কিন্তু সহিংসতা নয়, ঘৃণা নয়।
তরুণ প্রজন্ম এই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের চোখে স্বপ্ন, হাতে প্রযুক্তি, মনে প্রশ্ন। এই প্রশ্নই দেশকে এগিয়ে নেয়—যদি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় জ্ঞান, নৈতিকতা আর মানবিকতার আলোয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ—এসব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর তরুণদের দায়িত্ব—দেশকে ভালোবাসা, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সহজ পথে নয়, সঠিক পথে চলা।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমানো, নারী-পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষা করা—এসব আজ সময়ের দাবি। নদী বাঁচালে জীবন বাঁচে, বন বাঁচালে ভবিষ্যৎ বাঁচে। উন্নয়ন হবে, কিন্তু মানুষের ও প্রকৃতির ক্ষতি করে নয়। সবার আগে বাংলাদেশ মানে টেকসই উন্নয়ন—যেখানে আজকের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আগামীকে বন্ধক রাখা হবে না।
বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে তার মানবিকতা, শান্তিপ্রিয়তা ও কর্মশক্তির জন্য। প্রবাসীদের শ্রম, শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য—এসবই আমাদের পরিচয়। তবে এই পরিচয় ধরে রাখতে হলে ভেতরে শক্ত হতে হবে—আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা—এগুলো ছাড়া কোনো অর্জন টেকসই নয়।
শেষ পর্যন্ত “সবার আগে বাংলাদেশ” একটি ব্যক্তিগত শপথ। নিজের সুবিধা নয়, দেশের কল্যাণ; তাত্ক্ষণিক লাভ নয়, দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গল; বিভেদ নয়, সংহতি—এই বেছে নেওয়ার নামই দেশপ্রেম। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে এই শপথ রক্ষা করি, তবে বাংলাদেশ কেবল এগোবে না—উজ্জ্বল হবে। হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হোক—সবার আগে বাংলাদেশ।
গ্রন্হনা–সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।






















