
মো. মানিক হোসেন: শহরের যান্ত্রিক জীবনে আজ যখন মেঘের গর্জন শুনে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। তখন অবচেতন মনেই হাতটা চলে গেল পকেটের দিকে। দামী স্মার্টফোন আর চামড়ার ওয়ালেটটা যেন ভিজে না যায়। এই নাগরিক সতর্কতাই এখন আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু ঠিক আঠারো বছর আগে। যখন এই আমিই ছিলাম গ্রামের সেই অবাধ কিশোর। তখন বৃষ্টি মানে ছিল না কোনো হারানোর ভয়। ছিল না কোনো কৃত্রিম জড়তা। তখন বৃষ্টি মানে ছিল আকাশের বুক চিরে নেমে আসা এক পবিত্র প্রশান্তি। যা শরীর ছাড়িয়ে আত্মাকে তৃপ্ত করত। আজ সেই বৃষ্টির দিনে এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে পড়ছে। আমি আসলে শহর জয় করতে আসিনি। বরং নিজের শৈশবকে বিসর্জন দিতে এসেছি।
আঠারো বছর। সময়টা খুব কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ে ধুলোবালি জমেছে স্মৃতির ওপর। কিন্তু মোছেনি সেই কাঁদা মাটির টান। শহরের কংক্রিটের জঙ্গল আমাকে নিরাপত্তা দিলেও শান্তি দিতে পারেনি। আজ যখন টিনের চালের ওপর বৃষ্টির জল পড়ার সেই আদিম বাদ্যযন্ত্রের সুর মনে পড়ে। তখন মনে হয় শহরের এই এসি রুমের কৃত্রিম শীতলতা কতই না তুচ্ছ! গ্রামের সেই খড়ের চাল থেকে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির জল যখন চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ত। মনে হতো প্রকৃতি স্বয়ং আমাদের আশীর্বাদ করছে। সেই জল শরীরকে কেবল ভিজিয়েই দিত না। বরং এক পরম পবিত্রতায় ধুয়ে দিত মনের সব গ্লানি।
আমাদের ছোটবেলায় আবহাওয়া দপ্তরের কোনো অ্যাপ ছিল না, ছিল না স্যাটেলাইট ইমেজের জটিলতা। আমাদের ছিল অভিজ্ঞ চোখ আর বাতাসের ঘ্রাণ শোঁকার ক্ষমতা। ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে যখন দিগন্তে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখতাম। আমরা মেঘের অভিমুখ বলে দিতে পারতাম।
“ওই দেখ, মেঘটা তো ফুপুর বাড়ির দিক থেকে আসছে! না না, ওটা তো মামার বাড়ির মেঘ!” কিংবা তর্কে জড়িয়ে যেতাম “খালার বাড়ির দিকে মেঘ জমলেও বৃষ্টিটা মনে হয় এবার বোনের বাড়ির দিকেই হবে।”
আকাশের মেঘ দেখে আত্মীয় স্বজনের বাড়ির দিশা খুঁজে পাওয়ার সেই ভ্রাতৃত্ববোধ আর সরলতা আজ কোথায়? আকাশে যখন কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হতো। তখন সাদা বকের দল উড়ে যেত নিজেদের নীড়ের খোঁজে। ঘরমুখো পাখিদের সেই পাখা ঝাপটানো আর মেঘের গর্জনের মাঝে যে এক অদ্ভুত সিম্ফনি ছিল, তা কি আজকের এই শহরের ট্রাফিক জ্যামের হর্নের মাঝে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
বৃষ্টির দিন মানেই ছিল গ্রামীণ জনপদে এক মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি। রৌদ্রময় সকালে প্রতিবেশী চাচি আর দাদিরা যখন উঠোন ভরে ধান, পেঁয়াজ কিংবা পাট শুকাতে দিতেন, আকাশ কালো হওয়া মাত্রই শুরু হতো তাদের নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ। এক ঘর থেকে অন্য ঘরের মানুষেরা ছুটে আসত সাহায্য করতে। কারও ধান তোলার পর তারা আরেকজনের উঠোনে দৌড়াত। সেই যে একে অপরের সুখ-দুঃখে ভাগীদার হওয়া, সেই ‘প্রতিবেশী’ শব্দটি আজ ফ্ল্যাট বাড়ির দরজার আড়ালে গুমরে কাঁদছে।
অন্যদিকে, মাঠ থেকে ফেরা চাচাদের সেই দৃশ্যটিও ভোলা কঠিন। মাথায় ঘাসের এক প্রকাণ্ড বোঝা, এক হাতে গরু-ছাগলের ভেড়ার পালের রশি, আর অন্য কোলে হয়তো আদরের ছোট ভাইটি। বৃষ্টিতে ভেজা সেই ঘর্মাক্ত মানুষগুলোর চোখে ফসল বাঁচানোর দুশ্চিন্তা থাকলেও, বাড়ি ফেরার এক পরম নিশ্চিন্ত ভাব ছিল। তাদের সেই শক্ত হাতের বাঁধনে জড়িয়ে থাকা গরু-ছাগলগুলোও যেন বুঝত, বৃষ্টির এই তাণ্ডব থেকে বাঁচতে হলে তাদের মনিবের ওপরই ভরসা করতে হবে।
বৃষ্টি যখন বেশি হতো, গ্রাম্য জীবন তখন এক স্থির ছবির মতো থমকে যেত। ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় কৃষকের কপালে ভাঁজ পড়ত সত্য, কারও ভাঙা চাল দিয়ে জল ঢুকে ঘরের মেঝে কর্দমাক্ত হতো সত্য, কিন্তু এরই মাঝে বিনোদনের এক ফল্গুধারা বয়ে যেত। বড়রা যখন কোনো এক বাড়ির বারান্দায় তাসের আড্ডা বসাতেন, ছোটরা তখন সুযোগ বুঝে অন্য কোনো লুকানো ঘরে শুরু করত নিজেদের তাসের খেলা। আড়চোখে বড়দের এড়িয়ে সেই লুকানো আনন্দের স্বাদ ছিল অপার্থিব।
আর ছিল মুড়ি ভাজার ধুম। বৃষ্টির দুপুরে কড়াইতে যখন লবণের সাথে মুড়ি ফুটে উঠত, সেই ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করত। মা-চাচিদের সেই হাতে ভাজা মুড়ি আর নারকেল কোরা দিয়ে খাওয়ার স্বাদ কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের খাবারের চেয়েও হাজার গুণ বেশি ছিল।
বৃষ্টির দিনে গ্রামের কাঁচা রাস্তা মানেই ছিল এক চরম পরীক্ষা। কে কতবার আছাড় খেল, কার জামার পেছনের দিকটা কাদায় বেশি লেপ্টে গেল। এ নিয়েই চলত হাসাহাসি। সেই কাদামাটি মেখেই স্কুল যাওয়া-আসা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযান। বইয়ের ব্যাগটা বগলের নিচে চেপে ধরে প্যান্ট গুটিয়ে যখন আমরা দৌড় দিতাম, তখন পৃথিবীটা কত ছোট আর সুন্দর মনে হতো! আজ দামী জুতো পরে মার্বেল পাথরের মেঝেতে হাঁটতে গিয়েও সেই ভারসাম্য খুঁজে পাই না, যা ছিল সেই পিচ্ছিল কাদার পথে।
বৃষ্টির দিনে যদি কারও বাড়িতে বিয়ে লেগে যেত, তবে সেই আনন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে যেত সীমারেখা। বিয়ের বাড়ির প্যান্ডেলে জল পড়া ঠেকানোর কসরত, আর অন্যদিকে প্রতিবেশী ভাবি-চাচিদের ধামাইল গান আর নাচ। যখন বর-কনেকে গোসল করানোর সময় আসত, তখন আকাশের বৃষ্টি আর কলতলার জলের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকত না। সেই বৃষ্টির জলে ভিজে কাদামাখা আঙিনায় খাবারের জন্য পাত পেড়ে বসে থাকা। যেখানে চেয়ার-টেবিল না থাকলেও আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল না। আজ কমিউনিটি সেন্টারের বাফে ডিনারে সেই তৃপ্তি কোথায়?
স্মৃতির সবটাই যে মধুর, তা নয়। গ্রাম্য জীবনের সেই সোনালি দিনের পাশে এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকত উন্নত চিকিৎসার অভাব। বৃষ্টির দিনে যখন কারও অসুখ হতো, যখন গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত, তখন সেই কর্দমাক্ত পথ হয়ে উঠত নরক। অনেককে দেখেছি বিনাচিকিৎসায় ধুঁকতে, কারণ তখন গ্রামের সাথে শহরের সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। সেই কষ্টটা আজও আমাদের বুকের কোণে রয়ে গেছে।
আজ আমরা শহরে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। আমাদের নাতি-পুতিরা ড্রয়িংরুমে বসে ভিডিও গেম খেলে বড় হচ্ছে। তারা বৃষ্টি দেখলে ভয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়, কারণ তারা জানে না বৃষ্টির জলে ভেজার মধ্যে কত বড় মুক্তি লুকিয়ে আছে। আমরা শহরমুখী হতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি আমাদের পরিবারকে, দূরে সরিয়ে দিয়েছি আমাদের ভালোবাসার প্রতিবেশীদের।
শহরে আসা মানুষগুলো আর গ্রামে ফিরতে পারে না। তারা কেবল বৃষ্টির দিনে জানালার কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আর ডুকরে কেঁদে ওঠে। আজ আমি মানিক হোসেন যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন আমার মনে হচ্ছে। আমরা আসলে গ্রাম ছাড়িনি, বরং এক টুকরো জীবন্ত স্বর্গকে পেছনে ফেলে এক যান্ত্রিক নরকে বসবাস করছি।
হে বৃষ্টির ধারা, তুমি আজ যত পারো ঝরো। কিন্তু যদি পারো, তবে শহরমুখী এই যাযাবর মানুষগুলোকে অন্তত একবারের জন্য তাদের শৈশবের সেই সোঁদা মাটির ঘ্রাণে ফিরিয়ে নিয়ে যেও। আমাদের সেই খড়ের চাল, সেই টিনের বাদ্যযন্ত্র আর সেই তাসের আড্ডায় আবার একবার রাজা-মন্ত্রী হতে দিও।






















