• আজ

কথায় কথায় গুলি-খুনে আতঙ্কে খুলনাবাসী

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

খুলনা নগরসহ জেলায় একের পর এক গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বশত্রুতার জেরে সংঘটিত এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, অপহরণ, গুলি, ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আতঙ্কিত নগরবাসী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ঘটনায় মূলহোতারা অধরা। আবার গ্রেপ্তার আসামিদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতেও সাহস পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭১ জন। তাদের মধ্যে ২৩ জন গুলিতে নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। শুধু মহানগরীতেই ৩৪টি হত্যা মামলায় প্রাণ গেছে ৩৬ জনের।

একের পর এক গুলির ঘটনা: গত ২২ অক্টোবর নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলিতে নিহত হন তৌহিদুল ইসলাম তুষার (৩২)। একই দিন সন্ধ্যায় জিন্নাহপাড়ায় গুলিতে প্রাণ হারান খুশি আক্তার (২৫)। তুষার হত্যা মামলায় পুলিশের উপপরিদর্শক শাহ আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। এজাহারে শহিদুল ইসলাম সেজান, সাকিবুর রহমান জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খুশি আক্তারের বোন হাসি আক্তার আশিক, মিরাজ খানসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ঘটনার কয়েকদিন পরও আসামি গ্রেপ্তারে অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে নগরীর টুটপাড়া গাছতলা মন্দিরের কাছে গুলিবিদ্ধ হন রূপসা কলেজের প্রভাষক আকাশ কুণ্ডু। খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, চাঁদা না দেওয়ায় তাকে গুলি করা হয়। তুষার ও খুশি আক্তার হত্যাকাণ্ডের পেছনেও আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

গত ২৬ অক্টোবর রাত থেকে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পৃথক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন আরও তিনজন। তাদের মধ্যে বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক যুবদল সভাপতি আহিদুল ইসলাম বাদল, আমিরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সোহেল শেখ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সালমান হাওলাদার রয়েছেন। সালমানের ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

২০ ঘণ্টার মধ্যে তিন স্থানে গুলির ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এসব ঘটনায় থানায় কোনো মামলাও হয়নি। এর মধ্যে বটিয়াঘাটায় পরপর দুটি গুলির ঘটনার পর প্রত্যাহার করা হয়েছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেনকে। বুধবার তাকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।

এর আগে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় গুলিতে নিহত হন নাসিমুল গনি, যিনি নাসিম গ্রুপের প্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় নগরীর সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় গুলি ও হত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে।

আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপ: পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, খুলনার অপরাধজগতে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমায়ুন কবিরের হুমা বাহিনী, শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের টেম্পো গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিম গ্রুপ।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ রয়েছে। নূর আজিম ও আশিক গ্রুপ খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায়, শাওন গ্রুপ সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে এবং আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনী দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকায় সক্রিয় বলে দাবি করা হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাবু গ্রুপের প্রভাব রয়েছে বলেও সূত্রগুলোর ভাষ্য। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও পৃথক অপরাধে সংশ্লিষ্টতা তদন্তসাপেক্ষ।

অধরা মূলহোতারা: বিভিন্ন ঘটনায় হামলাকারী বা সন্দেহভাজনদের নাম সামনে এলেও অপরাধের পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও অস্ত্রের জোগানদাতাদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ২৪ জুন একটি মসজিদে ঢুকে দুই ব্যবসায়ীকে গুলি করার ঘটনায় আরমান হোসেনের নাম আসে। গত বছরের ৭ মে হত্যা, আগ্নেয়াস্ত্র ও দস্যুতাসহ অন্তত সাতটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। গত বছরের ১৯ মার্চ রাতে কৃষ্ণনগর এলাকায় কাজী রাশেদের বাড়িতে ঢুকে চারজনকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ইমরানসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ওই বছরের মে মাসে জামিনে মুক্ত হন। পরে ২ জুন এক ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদারকে হত্যাচেষ্টার মামলার প্রধান আসামি হিসেবে পরিচিত ঢাকাইয়া শামীমকে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছরের ১৩ মে জামিন পান তিনি। এ ছাড়া আদালতের সামনে জোড়া খুন এবং ডাকবাংলা এলাকায় শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মতো আলোচিত মামলার আসামিদের কেউ কেউ জামিনে বাইরে রয়েছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত দেড় বছরে খুলনায় তালিকাভুক্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ তিন থেকে ১৪টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সূত্রের ভাষ্য, গ্রেপ্তার হওয়া এসব অপরাধী অনেকেই বর্তমানে জামিনে মুক্ত।

ভয়ে মামলা করেন না অনেক ভুক্তভোগী: গত ৭ অক্টোবর নগরীর কেডি ঘোষ রোড থেকে খুলনার সদর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে একদল যুবক তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশি তৎপরতায় প্রায় ৪০ মিনিট পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী মামলা না করায় ঘটনাটিতে আইনি পদক্ষেপ জটিল হয়ে পড়ে। অপহরণে জড়িত সন্দেহে লাল মিয়াকে আটক করা হলেও তাকে অন্য মামলায় আদালতে পাঠানো হয়। ১২ দিনের মধ্যে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা, ভাঙচুর ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনায়ও আতঙ্ক ছড়ায়। মুখোশধারী যুবকদের হামলায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হন এবং এক কর্মীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার সময় সেখানে দুই শতাধিক মানুষ ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ব্যবস্থাপক মহিদুল ইসলাম রাজু বলেন, হামলার কারণ তাদের জানা নেই। কেউ চাঁদা চেয়েছিল বলেও তিনি জানেন না।

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, ওই ঘটনায় মোস্তফা আলম হিরা ও মারুফ নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ভাঙচুরে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফাহিম নামে একজন তাদের ডেকে নিয়ে যান। তাকে খুঁজছে পুলিশ। পরদিন মজিদ সরণিতে সন্ধানী ক্লিনিকের আরেকটি শাখায় ৮ থেকে ১০ যুবক গিয়ে ব্যবস্থাপককে খোঁজেন এবং চিকিৎসক পার্থ সাহাকে ‘ভালো হয়ে যা’ বলে হুমকি দেন। এ বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), খুলনার সভাপতি অধ্যাপক রমা রহমান বলেন, আমরা দেখছি, বিচারব্যবস্থা এমন হয়েছে যে, অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে আসছে। খুলনা শহরের সবাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। অপরাধীরা ধরাও পড়ছে, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে বের হয়ে আসছে। এতে সন্ত্রাসীরা আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। রাষ্ট্র কঠোর না হলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও কঠিন হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মাদক নির্মূলের ওপরও জোর দেন তিনি।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯, ২০২৩ সালে ১৭, ২০২৪ সালে ২৯ এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই মামলা হয়েছে ৩৪টি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার নয়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, অস্ত্র সরবরাহকারী ও অপরাধী চক্রের অর্থের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কার্যকর করা কঠিন হবে।

খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গত ১০ মাসে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আসছেন। অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না বা তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। দ্রুত জামিনে মুক্তি এবং ভুক্তভোগীদের অসহযোগিতার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।