• আজ ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

‘কই, কেউ তো আমাদের খবর নিলেন না’, মৃত্যুবার্ষিকীতে এ টি এম শামসুজ্জামানের স্ত্রী

| নিউজ রুম এডিটর ৭:১০ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২ গণমাধ্যম

আজ ২০ ফেব্রুয়ারি, অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁকে হারানোর এই এক বছরে পরিবারের মানুষদের কষ্ট বেড়েছে। একটা সময় প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের বাড়িতে আনাগোনা ছিল নাট্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষের। তিনি মারা যাওয়ার পর অভিনেতার পরিবারের লোকদের খবর নেননি তেমন কেউ। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই ক্ষোভ ঝরে পড়ল তাঁর স্ত্রী রুনি জামানের কণ্ঠে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত শুটিং থেকে বিরত থাকতে হবে। তখন প্রিয় অভিনেতাকে দেখতে অনেকেই ভিড় করতেন তাঁদের গেন্ডারিয়ার বাড়িতে। হাসপাতালফেরত দুর্বল শরীরে তখনো সহকর্মী ও অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতেন এই অভিনেতা। আড্ডা দেওয়া, পড়াশোনা করা, সিনেমার খবর রাখা ছিল তাঁর পছন্দের কাজ। করোনার পর পরিবারের অনেকেই বলেছিলেন, এখন করোনার সময় বাড়িতে লোক আসতে বারণ করা উচিত। সেটা শোনেননি এ টি এম শামসুজ্জামান। হাসিমুখে বলতেন, ‘ওরা আসতে চায়, তোমরা না কোরো না। তাহলে ওরা কষ্ট পাবে। করোনায় আমার কিছু হবে না।’ পরিবারের লোকেরা বুঝতেন, শিশুর মতো মিশুক মানুষটি আসলে সবার সঙ্গে কথা বলে শান্তি পেতেন। পরিবারের লোকদেরও তত দিনে চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। তাই তাঁরাও বারণ করতেন না। কিন্তু গত এক বছর তাঁদের বাড়িতে এই অঙ্গনের তেমন কোনো মানুষ আর যাননি।

এ টি এম শামসুজ্জামানকে ছাড়া একটা বছর। কেমন ছিলেন তাঁরা? রুনি জামান বলেন, ‘তিনি (এ টি এম শামসুজ্জামান) যেমন রেখে গেছেন, তেমনই আছি। আর কেমন থাকব?’ অভিমানী স্বরে তিনি বলতে থাকেন, ‘তিনি এক বছর হলো মারা গেছেন। তাঁকে সবাই অনেক ভালোবাসতেন। কই, এই এক বছর তো তাঁরা কেউ আমাদের খবর নিলেন না। সিনেমা বা নাটকের লাইনের মানুষ বলেন, কোনো মিডিয়াকর্মী-সাংবাদিক বলেন, তেমন কেউ এসে খবর নেননি। কিন্তু সবার তো উচিত ছিল গুণী এই মানুষের পরিবারের পাশে থাকা। একটু যোগাযোগ রাখা, দু-একটা কথা বলা। তাঁকে স্মরণ করার কোনো উদ্যোগ নিই। তিনি কি ৫০০ টাকার শিল্পী ছিলেন?’

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করে গেছেন এ টি এম শামসুজ্জামান। অসুস্থ হওয়ার আগে কখনো বিরতি নেননি। শুটিং না থাকলেও একটা সময় পর্যন্ত নিয়মিত এফডিসিতে যাওয়া-আসা করতেন। অনেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অভিনয় ছাড়া থাকতে পারেন না। এফডিসি, লাইট, ক্যামেরার সঙ্গ এবং সহশিল্পীদের ছাড়া তাঁর ভালো লাগে না। সুস্থ হয়ে তিনি আবার কাজে ফেরার ইচ্ছে পোষণ করতেন। সর্বশেষ ইচ্ছে ছিল একটি ছবি বানাবেন। সেটার চিত্রনাট্য লেখার কাজ কিছুটা এগিয়েছিলেন। এসবই এখন রুনি জামানদের কাছে স্মৃতি হয়ে গেছে। প্রিয় মানুষের পাওয়া একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অনেক সম্মাননা, রেখে যাওয়া বই, পাণ্ডুলিপির খাতা, ব্যবহারের জিনিসপত্র আগলে রেখেছেন তিনি। এসবের মধ্যেই এ টি এম শামসুজ্জামানকে খোঁজেন তাঁরা।

অভিনয়শিল্পীরা প্রয়াত হলেই তাঁদের পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে কেউ আর যোগাযোগ রাখেন না। এ আক্ষেপ জানিয়েছেন অনেকের স্বজন। একে তো প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক, তার ওপর যাঁদের কাছের মানুষ মনে করে এসেছেন, তাঁদের নির্লিপ্ততা, ভীষণ কষ্ট দেয় প্রয়াত গুণীজনের স্বজনদের। রুনি জামানদের মনে দানা বাঁধতে থাকে নানা প্রশ্ন, এত দিনের এই সম্পর্ক কি তবে মিছে? তিনি বলেন, ‘আমরা যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে স্মরণ করব। আমার স্বামীর একটা বাড়ি আছে, ঘর আছে। পরিবারের কিছু লোক আছে। সবার উদ্যোগে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।’

জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল রাতে বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেদিন তাঁর খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। সে রাতে তাঁকে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডাক্তার জানিয়েছিলেন, তাঁর অন্ত্রে প্যাঁচ লেগেছিল। সেখান থেকে আন্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা। এতে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এরপর কিছুটা ভালো হয়ে কাজে ফেরার দিন গুনছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। শ্বাসকষ্টের কারণে শুরুতে সবাই ধারণা করেন, করোনা।

পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসে। ১৯ ফেব্রুয়ারি কিছুটা সুস্থ বোধ করায় অভিনেতাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালে হঠাৎ করেই তিনি পরপারে পাড়ি জমান।
১৯৪৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন এ টি এম শামসুজ্জামান। তাঁর গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার ভোলাকোটের বড়বাড়ি আর ঢাকায় থাকতেন দেবেন্দ্র নাথ দাস লেনে। তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরু ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’য় সহকারী পরিচালক হিসেবে। প্রথম কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের জন্য। ছবির পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা। অভিনেতা হিসেবে পর্দায় আসেন ১৯৬৫ সালে। তারপর বহু চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন এ টি এম শামসুজ্জামান।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন পিপলস নিউজ‘এ । আজই পাঠিয়ে দিন feature.peoples@gmail.com মেইলে