
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ: এক সময় আমাদের সমাজে একটি সুস্থ ও যৌক্তিক প্রতিবাদী সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। যখন কোনো ব্যক্তি ন্যায়বিচার পেত না, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হতো কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো, তখন সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করত, সংবাদ সম্মেলন করত, গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হতো। এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল—ভুক্তভোগীর কণ্ঠকে দৃশ্যমান করা, সত্যকে সামনে আনা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সেই সংস্কৃতি আজ উল্টো পথে হাঁটছে।
বর্তমানে আমরা দেখছি এক বিকৃত প্রতিবাদী ধারা—যাকে বলা যায় “মব মানববন্ধন” ও “মব সংবাদ সম্মেলন”। এখানে ভুক্তভোগী নয়, বরং অভিযুক্ত বা সুবিধাভোগী পক্ষই আগে মাঠে নামে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যখন ন্যায়বিচারের আশায় গণমাধ্যমে কথা বলতে চান, তখনই শুরু হয় প্রতিপক্ষের সংগঠিত পাল্টা নাটক। কয়েক ঘণ্টার নোটিশে হাজির করা হয় কিছু ভাড়াটে লোক, দলীয় ক্যাডার কিংবা স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদীদের। তারা মানববন্ধন করে, সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেয়—“সব মিথ্যা”, “এটি ষড়যন্ত্র”, “মানসম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা”।
এই চিত্রটি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজ একটি পরিকল্পিত সামাজিক কৌশলে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ উঠলেই অভিযুক্ত পক্ষ আর আইনের মুখোমুখি হতে চায় না, বরং জনমত ব্যবস্থাপনায় নেমে পড়ে। সত্য-মিথ্যার বিচার আদালতে নয়, রাস্তার মানববন্ধনে কিংবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু লোকের বক্তব্যেই যেন নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এটি এক ভয়ংকর প্রবণতা, যা ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই অপসংস্কৃতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে এক শ্রেণির হলুদ সাংবাদিকতা। কিছু তথাকথিত সাংবাদিক অর্থের লোভে পড়ে নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছেন। তারা যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করছেন, কখনো একপক্ষীয় বক্তব্যকে “সংবাদ” বানাচ্ছেন, কখনো মিথ্যাকে সত্যের মোড়কে উপস্থাপন করছেন। যিনি অর্থ দেন, তার পক্ষেই শিরোনাম; যিনি ভুক্তভোগী কিন্তু অর্থহীন, তার কণ্ঠ হারিয়ে যায় পাতার নিচে বা একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
এখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সত্যের। সত্য আর অনুসন্ধানের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে দরকষাকষির পণ্য। মানববন্ধন আর সংবাদ সম্মেলন—যেগুলো ছিল নিপীড়িত মানুষের শেষ আশ্রয়—সেগুলোই আজ নিপীড়কের ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, সমাজে ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মব সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী ব্যক্তি যখন দেখেন—তার অভিযোগের বিপরীতে সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী লোকজন নিয়ে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনেকেই আর সামনে এগোতে সাহস পান না। ন্যায়বিচার চাওয়াটাই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও মারাত্মক হুমকি। সংবিধান নাগরিককে মত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে, সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনতা দিয়েছে সত্য তুলে ধরার। কিন্তু যখন সেই স্বাধীনতাকে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন তা আর স্বাধীনতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে প্রপাগান্ডার হাতিয়ার।
প্রশ্ন হলো—এই দায় কার? দায় শুধু হলুদ সাংবাদিকদের নয়, দায় আমাদের সামাজিক নীরবতারও। আমরা অনেক সময় জানি কোনটা সত্য, কোনটা সাজানো নাটক, তবু চুপ থাকি। ক্ষমতার কাছে মাথা নত করি। এই নীরবতাই মব সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে প্রথমত প্রয়োজন নৈতিক সাংবাদিকতা। সংবাদমাধ্যমকে মনে রাখতে হবে—তারা ক্ষমতার মুখপাত্র নয়, জনগণের কণ্ঠস্বর। দ্বিতীয়ত, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের অপব্যবহার রোধে নাগরিক সচেতনতা জরুরি। কে আয়োজন করছে, কেন করছে, কার স্বার্থে করছে—এসব প্রশ্ন তুলতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রকৃত ভুক্তভোগী যেন ভয়ভীতির মুখে না পড়ে এবং আইন যেন তার আশ্রয় হয়, মবের চাপ নয়।
সত্য কখনো মব দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না—এ কথা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। কিন্তু সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সাহসী কণ্ঠ, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং সচেতন সমাজ—এই তিনটির বিকল্প নেই। নইলে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন নামক প্রতিবাদের ভাষা একদিন পুরোপুরি অর্থহীন ও কলুষিত হয়ে যাবে, আর ন্যায়বিচার হারিয়ে যাবে ভিড়ের চাপে।
লেখক–
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।






















